
কক্স২৪ নিউজ ডেস্ক।
বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য নানাবিধ হুমকির মুখে পড়েছে। প্রাকৃতিক ও মানবসৃষ্ট—উভয় কারণেই বনের প্রাণ-প্রকৃতি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তবে পরিবেশবিদ ও গবেষকদের মতে, প্রাকৃতিক দুর্যোগের তুলনায় মানবসৃষ্ট ক্ষতিই বর্তমানে সুন্দরবনের জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের ক্ষতি সময়ের সঙ্গে অনেকাংশে কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হলেও জলবায়ু পরিবর্তনের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব, প্লাস্টিক বর্জ্য, বিষ দিয়ে মাছ শিকার, বন্যপ্রাণী পাচার এবং অপরিকল্পিত শিল্পায়ন সুন্দরবনের বাস্তুতন্ত্রকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
ফারাক্কা বাঁধের কারণে উজানের মিঠা পানির প্রবাহ কমে যাওয়ায় লবণাক্ততা বৃদ্ধি পেয়েছে, যা বনাঞ্চলের উদ্ভিদ ও প্রাণীকূলের জন্য নতুন সংকট সৃষ্টি করেছে। এসব কারণে জাতিসংঘের ইউনেস্কো বিশ্ব ঐতিহ্য কেন্দ্রের বিজ্ঞানী ও পরিদর্শক দল সুন্দরবনকে ‘বিপদাপন্ন বিশ্ব ঐতিহ্য’ তালিকাভুক্ত করার সুপারিশ করেছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, সুন্দরবনের অভ্যন্তরের নদী ও খালে মাছ ধরতে এক শ্রেণির অসাধু জেলে নিয়মিত বিষ প্রয়োগ করছে। এতে একদিকে যেমন প্রচুর মাছ ধরা পড়ছে, অন্যদিকে মাছের পোনা ও অন্যান্য জলজ প্রাণী মারা যাচ্ছে।
বিষাক্ত মাছ মানুষের খাদ্যচক্রে প্রবেশ করায় স্বাস্থ্যঝুঁকিও বাড়ছে। একই সঙ্গে বিষাক্ত পানি বনাঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে পশু-পাখি ও অন্যান্য জলজ প্রাণীর ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলছে। ফলে বনের প্রাকৃতিক প্রজনন ও জীববৈচিত্র্য ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
সাম্প্রতিক এক গবেষণায় সুন্দরবনসংলগ্ন মোংলা, পশুর ও রূপসা নদীর ১৭ প্রজাতির মাছে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি পাওয়া গেছে।
এর মধ্যে হরিণা চিংড়িতে মাইক্রোপ্লাস্টিকের পরিমাণ সবচেয়ে বেশি শনাক্ত হয়েছে।
ব্রাজিলের তিনটি বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়সহ সাতটি বিশ্ববিদ্যালয়ের যৌথ গবেষণায় উঠে এসেছে, এসব মাইক্রোপ্লাস্টিক মানবদেহে ক্যান্সার ও লিভারজনিত রোগের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। পাশাপাশি এটি পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
সুন্দরবনের বাঘসহ বিভিন্ন বন্যপ্রাণী পাচারে আন্তর্জাতিক চোরাকারবারি চক্র সক্রিয় রয়েছে। ওয়ার্ল্ড কনজারভেশন সোসাইটি (ডব্লিউসিএস)-এর গবেষণা অনুযায়ী, বন্যপ্রাণী সংক্রান্ত অপরাধের মাত্র ৩০ শতাংশ আসামি গ্রেফতার হয়।
এর মধ্যে মাত্র ২০ শতাংশ ক্ষেত্রে মামলা হয়।
গবেষণায় দেখা গেছে, ৪০০ মামলার এক-চতুর্থাংশ নিষ্পত্তি হতে আট বছর সময় লেগেছে। অধিকাংশ মামলা বছরের পর বছর ঝুলে থাকে। কম সাজা ও দীর্ঘ বিচার প্রক্রিয়ার কারণে অপরাধীরা পুনরায় একই অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে।
সুন্দরবনের প্রায় ৫৫ শতাংশ এলাকা অভয়ারণ্য হিসেবে ঘোষিত। কিন্তু অভিযোগ রয়েছে, অসাধু বন কর্মকর্তা-কর্মচারী ও রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের সহায়তায় নিষিদ্ধ এলাকাগুলোতেও সারা বছর মাছ শিকার চলছে। ফলে অভয়ারণ্যের মূল উদ্দেশ্য ব্যাহত হচ্ছে এবং বন্যপ্রাণীর নিরাপদ আবাসস্থল হুমকির মুখে পড়ছে।
সুন্দরবনের নদীপথে তেল, কয়লা, সার ও ক্লিংকারবাহী জাহাজ ডুবির ঘটনা অতীতে একাধিকবার ঘটেছে। এসব দুর্ঘটনায় নদীর পানি দূষিত হয়ে জীববৈচিত্র্যের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।
এছাড়া বনের ভেতর দিয়ে চলাচলকারী নৌযানের ঢেউয়ে নদীভাঙন বৃদ্ধি পাচ্ছে, গাছপালা নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে এবং বিকট শব্দে বন্যপ্রাণীর স্বাভাবিক বিচরণ ও প্রজনন ব্যাহত হচ্ছে। ডলফিনের অভয়ারণ্যও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে নৌযান চলাচলের কারণে।
জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। জলোচ্ছ্বাস ও জোয়ারের পানিতে সুন্দরবনের বিভিন্ন এলাকা তলিয়ে যাচ্ছে। এতে বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল, প্রজনন ক্ষেত্র ও সুপেয় পানির উৎস ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
অন্যদিকে ফারাক্কা বাঁধের কারণে উজান থেকে মিঠা পানির প্রবাহ কমে যাওয়ায় লবণাক্ততা বেড়েছে। এর ফলে অনেক গাছপালা মারা যাচ্ছে এবং বনজ জীববৈচিত্র্যের ওপর দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
আইইউসিএনের তথ্যমতে, সুন্দরবনের মহাবিপন্ন প্রাণীর তালিকায় রয়েছে বাঘ, ভোঁদড়, শকুন ও কচ্ছপ। বিপন্ন প্রাণীর তালিকায় রয়েছে বানর, মেছোবিড়াল ও উদবিড়াল। আর সংকটাপন্ন প্রাণীর তালিকায় রয়েছে বনবিড়াল, বাগদাশ, ইরাবতী ডলফিন ও শুশুক।
এছাড়া গত ২২ বছরে সুন্দরবনে ২৭ বার অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। এতে প্রায় ৭০ একর বনভূমি পুড়ে গেছে। পরিবেশবাদীদের অভিযোগ, অসাধু মাছ শিকারি ও কিছু দুর্নীতিগ্রস্ত বন কর্মকর্তার যোগসাজশে এসব আগুন লাগানোর ঘটনা ঘটেছে।
সুন্দরবন রক্ষায় আমরা’র কেন্দ্রীয় প্রধান সমন্বয়কারী মো. নুর আলম শেখ বলেন, সুন্দরবনের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি বিষ দিয়ে মাছ ধরা, বন্যপ্রাণী পাচার, শিল্প দূষণ এবং কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র। ফারাক্কা বাঁধের কারণে মিঠা পানির প্রবাহ কমে যাওয়ায় লবণাক্ততা বেড়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাতও ভয়াবহ। বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবন রক্ষায় ব্যর্থ হলে আগামী প্রজন্মের কাছে আমাদের জবাবদিহি করতে হবে।
সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মো. রেজাউল করিম চৌধুরী বলেন, বন অপরাধ দমনে টহল ও ড্রোন নজরদারি বৃদ্ধি করা হয়েছে। এর ফলে বিষ প্রয়োগ ও হরিণ শিকার কমেছে। বন কর্মকর্তাদের দায়বদ্ধতার আওতায় আনা হয়েছে। প্লাস্টিক ও পলিথিন দূষণও আগের তুলনায় কমেছে।
তিনি বলেন, মোংলা বন্দরের পিকনিক কর্নার এলাকা থেকে এখনো কিছু প্লাস্টিক দূষণ হচ্ছে, যা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজর দেওয়া প্রয়োজন।
পরিবেশ অধিদপ্তর খুলনার বিভাগীয় উপপরিচালক শরীফুল ইসলাম বলেন, মোংলা এলাকার শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো নিয়মিত পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে। বায়ু ও পানি দূষণ নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে। রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রও নিয়মিত মনিটরিং করা হচ্ছে।
পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী লায়ন ড. শেখ ফরিদুল ইসলাম বলেন, নিয়মিত টহল ও ড্রোন নজরদারির কারণে চলতি মৌসুমে সুন্দরবনে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেনি। বিষ দিয়ে মাছ শিকারের ঘটনায় সংশ্লিষ্ট এলাকায় দায়িত্বরত বন কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তিনি আরও বলেন, সুন্দরবনের সঙ্গে লোকালয়ের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করতে খাল খনন ও প্রতিবন্ধক ব্যবস্থা গড়ে তোলা হচ্ছে। বন অপরাধ দমন, বননির্ভর মানুষের বিকল্প কর্মসংস্থান এবং বন্যপ্রাণী সুরক্ষায় সরকার কাজ করছে। বনকেন্দ্রিক কোনো ধরনের রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন বরদাশত করা হবে না।