
কক্স২৪নিউজ ডেস্ক।
তীব্র তাপদাহের সাথে পাল্লা দিয়ে দেশজুড়ে বাড়ছে লোডশেডিং। একদিকে অসহনীয় গরম, অন্যদিকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎহীনতা—সব মিলিয়ে জনজীবন এখন বিপর্যস্ত। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে বিদ্যুৎ পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। বিদ্যুৎ বিভাগের পক্ষ থেকে উৎপাদনের নানা পরিসংখ্যান দেওয়া হলেও মাঠপর্যায়ে তার কোনো প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না। সাধারণ মানুষের অভিযোগ, এটি কেবল গরমের প্রভাব নয়, বরং বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনার চরম দুর্বলতার বহিঃপ্রকাশ।
চৈত্র-বৈশাখীর এই তীব্র গরমে দেশের অধিকাংশ এলাকায় দিনে-রাতে ৫ থেকে ৮ ঘণ্টা, কোথাও কোথাও তারও বেশি সময় লোডশেডিং হচ্ছে। শহরের তুলনায় গ্রামাঞ্চলের অবস্থা আরও শোচনীয়।
পরীক্ষা থাকলেও নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুতের অভাবে পড়াশোনায় ব্যাঘাত ঘটছে। রাতের বেলা লোডশেডিংয়ের কারণে শিক্ষার্থীদের ঘুমের ব্যাঘাত ঘটছে, যা তাদের স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
ঘন ঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাটে ফ্রিজে রাখা পচনশীল দ্রব্য নষ্ট হচ্ছে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প কারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় বড় ধরনের আর্থিক লোকসানের মুখে পড়ছেন ব্যবসায়ীরা।
গরমে অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া রোগীদের সংখ্যা বাড়ছে। অপারেশন থিয়েটার ও জরুরি বিভাগগুলোতে জেনারেটর দিয়ে কাজ চালানো হলেও দীর্ঘস্থায়ী লোডশেডিংয়ে চিকিৎসাসেবা ব্যাহত হচ্ছে।
সরকারের পক্ষ থেকে শতভাগ বিদ্যুতায়নের দাবি করা হলেও বর্তমান পরিস্থিতি বলছে ভিন্ন কথা। বিদ্যুৎ খাতের বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এই সংকটের পেছনে তিনটি প্রধান কারণ রয়েছে:
পর্যাপ্ত গ্যাস ও কয়লার অভাবে অনেক বিদ্যুৎকেন্দ্র তাদের পূর্ণ ক্ষমতায় উৎপাদন করতে পারছে না। আমদানিনির্ভর জ্বালানি নীতির কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে দামের উঠানামা দেশের অভ্যন্তরীণ বিদ্যুৎ ব্যবস্থাকে ভঙ্গুর করে তুলেছে।
অনেক এলাকায় সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও জরাজীর্ণ সঞ্চালন লাইন ও ট্রান্সফরমারের সমস্যার কারণে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রাখতে হচ্ছে। সামান্য ঝড় বা বৃষ্টিতেই দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন থাকছে অনেক এলাকা।
চাহিদার সঠিক পূর্বাভাস দিতে না পারা এবং লোডশেডিংয়ের কোনো সুনির্দিষ্ট শিডিউল না থাকায় জনমনে ক্ষোভ বাড়ছে। অনেক ক্ষেত্রে অভিযোগ কেন্দ্রে ফোন করেও কোনো সদুত্তর পাওয়া যাচ্ছে না।
বোরো মৌসুমের এই সময়ে সেচ কাজের জন্য নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ অত্যন্ত জরুরি। কিন্তু লোডশেডিংয়ের কারণে কৃষকরা সময়মতো সেচ দিতে পারছেন না। এতে ধানের ফলন বিপর্যয়ের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে, যা দীর্ঘমেয়াদে দেশের খাদ্য নিরাপত্তাকে ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে।
বিদ্যুৎ পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি সাধারণ মানুষের। জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করার পাশাপাশি বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা আনা জরুরি। অন্যথায়, এই অসহনীয় লোডশেডিং সাধারণ মানুষের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে দিতে পারে।
বিদ্যুৎ বিভাগ বলছে, পরিস্থিতি সামাল দিতে তারা আপ্রাণ চেষ্টা করছেন এবং দ্রুতই কিছু নতুন ইউনিট উৎপাদনে আসবে। তবে সাধারণ মানুষ চায় কথার চেয়ে কাজের প্রতিফলন—অর্থাৎ দ্রুত নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ।
লোডশেডিং এখন আর কেবল একটি টেকনিক্যাল সমস্যা নয়, এটি এখন একটি মানবিক ও অর্থনৈতিক সংকটে রূপ নিয়েছে। বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনার এই “চরম দুর্বলতা” কাটিয়ে ওঠা এখন সময়ের দাবি।