
কক্স২৪ নিউজ ডেস্ক।
১৫ জুলাই জাতীয় সংসদের বাজেট অধিবেশন শেষ হয়েছে। এটি ছিল ত্রয়োদশ সংসদের দ্বিতীয় অধিবেশন।
২৬ কর্মদিবসের এ অধিবেশন দেশের সংসদীয় গণতন্ত্রের ইতিহাসে নতুন মাইলফলক রচনা করেছে। প্রাণবন্ত সংসদ, সরকার ও বিরোধী দলের দায়িত্বশীল আচরণ, জাতীয় সব গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু আলোচনার কারণে জনগণের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ সৃষ্টি করেছে বর্তমান সংসদ। ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত এ সংসদ অল্প সময়ের মধ্যেই রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।
অতীতের তিক্ত অভিজ্ঞতা : বাংলাদেশের ৫৫ বছরের ইতিহাসে বারবার গণতন্ত্র হোঁচট খেয়েছে।
এর অন্যতম কারণ কার্যকর সংসদের অনুপস্থিতি। স্বাধীনতার পর প্রথম সংসদ ছিল বিরোধী দলশূন্য। কিন্তু সেই সংসদেই বহুদলীয় গণতন্ত্রের পথ রুদ্ধ করে একদলীয় শাসনব্যবস্থা কায়েম করা হয়েছিল। ১৯৭৫-এর পর বাংলাদেশে রাষ্ট্রপতি শাসনব্যবস্থা চালু হয়।
নব্বইয়ের গণ আন্দোলনে বিজয়ের পর জনগণের আকাক্সক্ষার আলোকে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া দেশে আবারও সংসদীয় গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনেন। কিন্তু দ্বিতীয় দফায় সংসদীয় গণতন্ত্রের পথ মসৃণ ছিল না। বারবার সংসদকে অকার্যকর করার চেষ্টা, অশ্লীল, কুরুচিপূর্ণ ভাষায় প্রতিপক্ষকে আক্রমণ, গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু পাশ কাটিয়ে যাওয়ার ফলে সংসদ জনগণের আকাক্সক্ষা পূরণে ব্যর্থ হয়। ১৯৯১ সালে বিরোধী দলগুলো একসঙ্গে পদত্যাগ করলে সংসদের মেয়াদ পূর্ণ হতে পারেনি। ১৯৯৬ সালে জাতীয় সংসদের দুটি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।
প্রথমটি ছিল সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা। ওই বছরের ১৫ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ওই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টি, জামায়াত অংশগ্রহণ করেনি। নির্বাচনের পর কেবল নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিল পাস করে সংসদ বিলুপ্ত করা হয়। পরের নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত সংসদ আলোচিত ছিল কুৎসিত ভাষায় আক্রমণের জন্য। জনগণের এজেন্ডা নিয়ে কথা বলার চেয়ে সরকার ও বিরোধী দলের কাদা ছোড়াছুড়ির কারণে এ সংসদ ছিল সমালোচিত। এ প্রবণতা আরও তীব্র হয় ২০০১ সালের সংসদে। বিরোধী দল সংসদে সমস্যা সমাধানের চেয়ে রাজপথে আন্দোলনের পথ বেছে নেয়। ফলে সংসদ হয়ে যায় অকার্যকর। সংসদীয় গণতন্ত্রের এই অস্থিরতার সুযোগে ২০০৭ সালে গণতন্ত্রবিরোধী শক্তি ক্ষমতা দখল করে। আসে এক-এগারো। দীর্ঘ দুই বছর মইন উদ্দিন-ফখরুদ্দীনের অনির্বাচিত সরকার সেনা ও সুশীল সমাজের সমর্থনে দেশ চালায়। ২০০৮-এর নির্বাচনের পর দেশবাসী আশা করেছিল এবার গণতন্ত্র প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পাবে। কিন্তু আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সংসদে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল করে। এরপর সংসদকে রাবার স্ট্যাম্প বানিয়ে যা খুশি করা হয়। নিজেদের স্বার্থে সংবিধান কাটাছেঁডা করা, বিরোধী দলকে কথা বলতে না দেওয়ার মাধ্যমে কার্যত গণতন্ত্রই হত্যা করা হয়। ২০১৪ সালে ভোটারবিহীন নির্বাচন, ২০১৮ সালে রাতের ভোট এবং ২০২৪ এর আমি-ডামি নির্বাচন গণতন্ত্রের কফিনে শেষ পেরেক ঠুকে দেয়। সংসদ পরিণত হয় সার্কাসে। এই প্রেক্ষাপটে ২০২৪-এর গণ অভ্যুত্থান সংঘটিত হয়। যেখানে মানুষের লড়াইয়ের অন্যতম লক্ষ্য ছিল ভোটের অধিকার আর জনগণের ক্ষমতায়ন। এবারের সংসদের কাছে তাই দেশের নাগরিকদের প্রত্যাশা অনেক। জনগণ সংসদকে কার্যকর ও অর্থবহ দেখতে চায়।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের ইতিবাচক যাত্রা : জনগণ তাদের সমস্যার কথা যেন জাতীয় সংসদে আলোচনা হয় সেটি আশা করে। সংসদের প্রথম দুটি অধিবেশন মানুষের আকাক্সক্ষা পূরণে অনেকটাই সফল হয়েছে। আর এটি সফল করতে প্রধান ভূমিকা রাখছেন সংসদ নেতা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। পাশাপাশি বিরোধী দলের নেতার দায়িত্বশীল ভূমিকা জনগণের কাছে প্রশংসিত হচ্ছে। অতীতের ১২টি সংসদের সীমাবদ্ধতাগুলো পর্যালোচনা করে সংসদ নেতা প্রথম থেকেই সংসদ কার্যকর ও অর্থবহ করতে কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিয়েছেন।
সংসদে উপস্থিতি : অতীতে সবচেয়ে বড় সমস্যা ছিল ক্ষমতাসীন দলের সদস্যদের সংসদের কার্যক্রমে অংশগ্রহণে অনীহা। বিশেষ করে মন্ত্রীরা সংসদ কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করার চেয়ে নিজেদের মন্ত্রণালয়ে বেশি সময় দিতেন। সরকারি দলের সদস্যদের অনুপস্থিতিতে বিরোধী দলও সংসদে আগ্রহ হারিয়ে ফেলত। বহুবার কোরামের অভাবে সংসদ অধিবেশন শুরু করতে বিলম্ব হয়েছে। সদস্যদের অনুপস্থিতিতে সংসদের কার্যক্রম গুরুত্ব হারিয়েছে। অতীতের এসব ঘটনা অত্যন্ত তীক্ষèভাবে পর্যবেক্ষণ করেছেন বর্তমান সংসদ নেতা। এজন্যই প্রথম অধিবেশন থেকে তিনি সংসদে উপস্থিতিকে অগ্রাধিকার দিচ্ছেন। প্রধানমন্ত্রীর কাজের চাপ সামাল দিয়ে অধিবেশন শুরুর আগেই সংসদে হাজির হয়ে তারেক রহমান দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। নিজের উপস্থিতি নিশ্চিত করে তিনি সরকারি দলের অন্য সদস্যদের সংসদে ঠিক সময়ে হাজির হওয়ার নির্দেশনা দিয়েছেন। আমরা দেখেছি, প্রধানমন্ত্রী সরকারি কাজে সিলেটে গিয়ে বিমানবন্দরে কয়েকজন সংসদ সদস্যকে দেখে তাঁদের সংসদে উপস্থিত থাকার নির্দেশ দেন। এটা ছিল সব সংসদ সদস্যের জন্য একটি বার্তা। সংসদ নেতার উপস্থিতির কারণে মন্ত্রীরাও সংসদে ছিলেন নিয়মিত। এ ক্ষেত্রে বিরোধী দলের নেতার ভূমিকাও প্রশংসনীয়। সংসদ নেতার মতো তিনিও সংসদে উপস্থিতির ক্ষেত্রে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। প্রতিদিনই তিনি বিরোধী দলের সদস্যদের মধ্যে সবার আগে উপস্থিত থেকেছেন। এতে অন্য বিরোধী দলের সদস্যরাও সংসদে উপস্থিতির বিষয়ে আগ্রহী হয়েছেন। ফলে সংসদ ছিল প্রাণবন্ত।
গঠনমূলক আলোচনা : অতীতে আমরা দেখেছি, সংসদে গঠনমূলক আলোচনা-সমালোচনা হয়েছে খুব কম। বিরোধী দলের একমাত্র কাজ ছিল সরকারের সমালোচনা। তারা সরকারের ভালো কাজেরও প্রশংসা করত না। আবার ১৯৮৮, ২০১৪ ও ২০১৮ সালের সংসদে আমরা দেখেছি গৃহপালিত বিরোধী দল। যাদের একমাত্র কাজ ছিল সরকারের প্রতি অকুণ্ঠ সমর্থন। ফলে সংসদ তামাশায় পরিণত হয়েছিল। সংসদে সরকারি দল বিরোধী দলকে কথা বলতে দিত না। বিরোধী দলকে সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে দমিয়ে রাখা হতো। আক্রমণাত্মক ভাষায় সমালোচনা করা হতো বিরোধী দলকে, এমনকি মৃত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কুৎসিত ও কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য করা হতো। সংসদ হবে ভারসাম্যের। এখানে সরকারি দল বিরোধী দলকে কথা বলার অধিকার দেবে। সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে সবকিছু চাপিয়ে দেবে না। অন্যদিকে বিরোধী দল অন্ধের মতো শুধু সরকারের সমালোচনা করবে না। সরকারের ভালো কাজের প্রশংসা করবে, ভুল ধরিয়ে দেবে, খারাপ কাজের সমালোচনা করবে। এ রকম একটি আদর্শ সংসদের স্বপ্ন বিগত ৫৫ বছরে পূরণ হয়নি। কিন্তু এবারের প্রথম দুটি অধিবেশন, বিশেষ করে সদ্য সমাপ্ত বাজেট অধিবেশন শেষে বলাই যায়, বর্তমান জাতীয় সংসদ সেই স্বপ্নের পথে হাঁটছে।
বিরোধী দলের প্রশংসনীয় ভূমিকা : সংসদ নেতা বিরোধী দলকে সমান সুযোগ ও সম্মান দিয়েছেন। সরকারি দলের নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকলেও একাধিক সংসদীয় কমিটিতে সরকারি ও বিরোধী দলের সমানসংখ্যক সদস্য অন্তর্ভুক্ত করে তারেক রহমান বাংলাদেশের সংসদীয় গণতন্ত্রের ইতিহাসে অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। বিরোধী দলের সঙ্গে সৌহার্দপূর্ণ সম্পর্ক স্থাপনের মাধ্যমে তিনি একটি নতুন ধারার সূচনা করেছেন। বাজেট অধিবেশনে আমরা দেখেছি, সংসদ নেতা অধিবেশনের বিরতিতে বিরোধীদলীয় নেতার সঙ্গে কুশল বিনিময় করেছেন। এই ছোট্ট ঘটনাটি বাংলাদেশের সংসদীয় গণতন্ত্রের ইতিহাসে অনন্য উদাহরণ। এ ক্ষেত্রে সংসদের স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারের ভূমিকাও ছিল প্রশংসনীয়। তাঁরা বিরোধী দলের সদস্যদের কথা বলার সুযোগ দিয়েছেন। সংসদ প্রাণবন্ত রাখতে দায়িত্বশীল আচরণ করেছেন।
সংসদে সুস্থ আলোচনা : এবারের সংসদে আরেকটি বিষয় সবার দৃষ্টি কেড়েছে। সেটি হলো সংসদে কুরুচিপূর্ণ বক্তব্য অনেকটাই কমে এসেছে। যদিও তরুণ প্রজন্মের কয়েকজন সদস্যকে দেখা গেছে অনভিপ্রেত বিষয়ে কথা বলে সময় নষ্ট করতে। সংসদে নেই এমন ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে অসত্য তথ্য প্রদানের ঘটনাও ঘটেছে। কিন্তু এটি সংসদের মূল কার্যক্রমের সঙ্গে সম্পর্কিত নয়। আশা করি তরুণ প্রজন্মের সংসদ সদস্যরা দ্রুত সংসদের রীতিনীতি রপ্ত করবেন। সংসদ নেতার উদ্যোগে যে চমৎকার পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে তা নষ্ট করবেন না।
জনগুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে আলোচনা : এবারের সংসদের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, আমাদের চারপাশে সব ধরনের জরুরি জনগুরুত্বপূর্ণ ইস্যু নিয়ে সদস্যরা আলোচনা করছেন। বন্যা, হামে শিশুর মৃত্যু, ইউনূস সরকারের দুর্নীতি, বিদেশে অর্থ পাচার, বৃষ্টির কারণে এইচএসসি পরীক্ষায় শিক্ষার্থীদের ভোগান্তি ইত্যাদি সব বিষয়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল জাতীয় সংসদ। সরকারি দল বিরোধী দলের যেকোনো ইস্যুতে আলোচনার সুযোগ করে দিয়েছে। ফলে সংসদ হয়ে উঠেছে জনগণের আস্থার প্রতীক।
সংসদ নেতার দিকনির্দেশনা : প্রধানমন্ত্রী কেবল সংসদে উপস্থিতির রেকর্ড করেননি, তিনি দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার রূপরেখা দেখিয়েছেন জাতীয় সংসদে। প্রতি সপ্তাহে প্রশ্নোত্তর পর্বে নীতিনির্ধারণী দিকনির্দেশনা দিয়েছেন। যেমন বন্ধ কলকারখানা চালু, বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনা, সব গৃহস্থালিতে এলপিজি সিলিন্ডার ব্যবহারের মাধ্যমে শিল্পকারখানায় গ্যাসসংকট সমাধানের উদ্যোগ ইত্যাদি বিষয় সংসদে তুলে ধরার মাধ্যমে জনগণকে সরকারের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে অবহিত করেছেন। এটাই সংসদীয় গণতন্ত্রের জবাবদিহিতা, যার সূচনা করলেন সংসদ নেতা। এবারের সংসদে প্রধানমন্ত্রী রাষ্ট্রকাঠামোর রূপরেখা তুলে ধরেছেন। লাখো শহীদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত বাংলাদেশের স্বাধীনতা সবার ওপরে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সঙ্গে আপস নেই। এ বক্তব্যের মাধ্যমে জাতির কাছে দেশের প্রকৃত ইতিহাস তুলে ধরেছেন প্রধানমন্ত্রী।
সংসদীয় গণতন্ত্রে জনগণের সার্বভৌমত্বের প্রতীক হলো সংসদ। কিন্তু অতীতে সংসদকে সরকারি দলের সব কর্মকাণ্ডের বৈধতা দেওয়ার জন্য ব্যবহার করা হয়েছে। সেই সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে এসে সংসদ নেতা বাংলাদেশে সংসদীয় গণতন্ত্রের নতুন দিগন্ত উন্মোচিত করেছেন।