
কক্স২৪ নিউজ ডেস্ক।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, মাদকের ভয়াবহ ছোবল থেকে দেশকে রক্ষা করতে সরকার বিদ্যমান আইনি কাঠামো শক্তিশালী ও যুগোপযোগী করার উদ্যোগ নিয়েছে। ‘মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন’ সংশোধন ও আধুনিকায়নের কাজ চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে, যা আগামী কয়েকদিনের মধ্যেই জাতীয় সংসদে উত্থাপন করা হবে।
মন্ত্রী আজ সকালে বাংলাদেশ সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে ‘২৬ জুন মাদকদ্রব্যের অপব্যবহার ও অবৈধ পাচার বিরোধী আন্তর্জাতিক দিবস’ উপলক্ষ্যে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর আয়োজিত প্রেস ব্রিফিং এবং লাইসেন্সপ্রাপ্ত বেসরকারি মাদকাসক্তি নিরাময় ও পুনর্বাসন কেন্দ্রসমূহের অনুকূলে সরকারি অনুদানের চেক বিতরণ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন।
মন্ত্রী বলেন, অপরাধীরা এখন প্রযুক্তির সহায়তায় অনলাইন ও অর্থ পাচারের মাধ্যমে মাদক ব্যবসা পরিচালনা করছে। তাই কেবল নড়বড়ে আইনি ভিত্তি দিয়ে এই অপরাধ দমন সম্ভব নয়। অপরাধীদের কঠোর শাস্তি এবং সমাজ পরিবর্তনের জন্য একটি অভেদ্য আইনি দেয়াল গড়ে তোলা হচ্ছে।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের (DNC) বিদ্যমান সীমাবদ্ধতা ও তা দূরীকরণের সরকারি পরিকল্পনা তুলে ধরে মন্ত্রী বলেন, “আমাদের কর্মকর্তাদের ঢাল-তলোয়ারহীন নিধিরাম সর্দারের মতো খালি হাতে সশস্ত্র মাদক চোরাকারবারিদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে হয়। কর্মকর্তাদের সক্ষমতা বাড়াতে অধিদপ্তরে অত্যাধুনিক অস্ত্র, পর্যাপ্ত ট্রান্সপোর্টেশন ও ডগ স্কোয়াড যুক্ত করা হচ্ছে। এছাড়া আসামিদের থানায় সোপর্দ করার মধ্যবর্তী সময়ের জন্য আধুনিক হাজতখানা নির্মাণ করা হবে।”
মামলা জটের কারণে আসামিরা যেন পার পেয়ে না যায়, সে লক্ষ্যে মাদক সংক্রান্ত অপরাধের দ্রুত বিচারের জন্য আলাদা ‘বিশেষ ট্রাইব্যুনাল’ ও এখতিয়ার সম্পন্ন আদালত গঠনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে বলে মন্ত্রী জানান। তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, মাদকের পাশাপাশি অনলাইন জুয়া রোধে সম্প্রতি একটি আধুনিক আইন উত্থাপন করা হয়েছে। পর্যায়ক্রমে সাইবার অপরাধ দমন এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর আধুনিকায়ন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে আইনি সংস্কার আনা হচ্ছে।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত এক জাতীয় গবেষণার তথ্য উল্লেখ করে মন্ত্রী জানান, দেশে বর্তমানে প্রায় ৮২ লাখ মানুষ (মোট জনসংখ্যার প্রায় ৪.৮৮ শতাংশ) মাদকাসক্ত। নতুন নতুন সিনথেটিক ও সেমি-সিনথেটিক মাদকের বিস্তারে এই সমস্যা আরও জটিল আকার ধারণ করেছে।
মাদকাসক্তদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনে সরকারের নানামুখী পদক্ষেপের বিবরণ দিয়ে মন্ত্রী বলেন, ঢাকার তেজগাঁওয়ের নিরাময় কেন্দ্রসহ তিনটি বিভাগীয় শহরের কেন্দ্রের শয্যা সংখ্যা বৃদ্ধি করা হয়েছে। এছাড়া ঢাকাস্থ কেন্দ্রীয় মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রকে ২৫০ শয্যায় উন্নীতকরণের কাজ চলমান রয়েছে। একই সাথে দেশের ৭টি বিভাগীয় শহরে (চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনা, বরিশাল, রংপুর, সিলেট ও ময়মনসিংহ) ১৪১৩ কোটি টাকা ব্যয়ে ২০০ শয্যা বিশিষ্ট অত্যাধুনিক মাদকাসক্তি নিরাময় ও পুনর্বাসন কেন্দ্র নির্মাণের প্রকল্প শুরু হয়েছে, যেখানে চিকিৎসা শেষে তরুণদের দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণের মাধ্যমে সমাজের মূল স্রোতে ফিরিয়ে আনা হবে।
মন্ত্রী আরো বলেন, সরকারি সুবিধার পাশাপাশি বেসরকারি উদ্যোগকে গতিশীল করতে চলতি ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরে দেশব্যাপী লাইসেন্সপ্রাপ্ত ৪০৩টি কেন্দ্রের মধ্যে নির্বাচিত ৭৩টি বেসরকারি মাদকাসক্তি নিরাময় ও পুনর্বাসন কেন্দ্রকে মোট ১ কোটি ১০ লক্ষ টাকা আর্থিক অনুদান প্রদান করা হচ্ছে। তিনি বেসরকারি কেন্দ্রগুলোকে বাণিজ্যিক দৃষ্টিভঙ্গি পরিহার করে কঠোরভাবে সরকারি বিধিমালা ও জাতীয় গাইডলাইন অনুসরণ করে মানবিক সেবা নিশ্চিত করার আহ্বান জানান।
এর আগে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ঢাকা মেট্রোপলিটন এলাকার নির্বাচিত ১৫টি বেসরকারি মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রের প্রতিনিধিদের হাতে অনুদানের চেক হস্তান্তর করেন।
অনুষ্ঠানে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মনজুর মোর্শেদ চৌধুরী, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মোঃ হাসান মারুফ-সহ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাবৃন্দ, বেসরকারি মাদকাসক্তি নিরাময় ও পুনর্বাসন কেন্দ্রসমূহের প্রতিনিধিবৃন্দ এবং প্রিন্ট, ইলেকট্রনিক ও অনলাইন মিডিয়ার সাংবাদিকবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।