
কক্স২৪ নিউজ ডেস্ক।
আজ ২৩ জুন, ঐতিহাসিক বেদনাবিধুর পলাশী দিবস। ১৭৫৭ সালের এই দিনে ভাগীরথী নদীর তীরে পলাশীর আমবাগানে বাংলা, বিহার ও ওড়িশার নবাব সিরাজউদ্দৌলাকে যুদ্ধের নামে দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে পরাজিত করা হয়। বিশ্বাসঘাতকরা নির্মমভাবে হত্যা করে বাংলার আশা-আকাঙ্ক্ষার নবাবকে। আর সেসময় নিস্তব্ধ হয়ে যায় চারদিক। রক্তাক্ত হয়ে পড়ে পলাশীর সেই সবুজ-শ্যামল আম্রকানন। এর মধ্য দিয়ে প্রায় দুইশ (১৯০) বছরের জন্য অস্তমিত হয় বাংলার স্বাধীনতার সূর্য। তাই আমাদের কাছে দিনটি শুধু একটি যুদ্ধের স্মৃতি নয়, বরং হারানো স্বাধীনতা ও বিশ্বাসঘাতকতার নির্মম ইতিহাসের প্রতীক। এজন্য দিনটিকে পলাশী ট্র্যাজেডি দিবস হিসাবে পালন করে বাঙালি।
বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজউদ্দৌলাকে সিংহাসন থেকে উচ্ছেদ করার জন্য দুজন ব্রিটিশ সেনাপতি ক্যাপ্টেন ক্লাইভ ও অ্যাডমিরাল ওয়াটসনের নেতৃত্বে একদল সৈন্যকে জাহাজে মাদ্রাজ থেকে বাংলায় পাঠানো হয়। তাদের উদ্দেশ্য ছিল নবাবকে সিংহাসন থেকে উৎখাত করে বাংলার মসনদ দখল করা। এজন্য ব্রিটিশরা এক বিশাল ষড়যন্ত্রের পথ বেছে নেয়। তাদের সেনাপতি লর্ড ক্লাইভ ভারতীয় ধনকুবের জগৎশেঠ, রাজ কর্মচারী রায়দুর্লভ, রাজবল্লভ এবং রাজপরিবারের উমিচাঁদ, ঘষেটি বেগম প্রমুখের সঙ্গে আলোচনা করেন।
তাদের মাধ্যমে ব্রিটিশরা জয়ী হলে নবাবের প্রধান সেনাপতি মীরজাফরকে বাংলার মসনদে বসানো হবে বলে আশ্বাস দেয় ক্লাইভ। কিন্তু নবাব ষড়যন্ত্রের নেপথ্য নায়ক মীরজাফরকে সন্দেহ করে প্রধান সেনাপতির পদ থেকে অপসারণ করে আব্দুল হাদীকে তার স্থলাভিষিক্ত করেন।
কূটচালে পারদর্শী মীরজাফর তখন পবিত্র কুরআন ছুঁয়ে শপথ করে নবাবের মন গলিয়ে পুনরায় প্রধান সেনাপতি পদে বসেন। সেসময়ে নেওয়া ওই ভুল সিদ্ধান্তই নবাব সিরাজউদ্দৌলার জন্য ‘কাল’ হয়ে দাঁড়ায়।
পলাশীর আম্রকাননে সকাল সাড়ে ১০টায় ইংরেজ ও নবাবের বাহিনীর মধ্যে যুদ্ধের নামে একধরনের প্রহসন অনুষ্ঠিত হয়। প্রধান প্রধান সেনাসমন্তের সবাই যুদ্ধে অংশগ্রহণে বিরত থাকে। মুষ্টিমেয় কয়েকজন অংশ নেন। সেদিনের সেই যুদ্ধে কুচক্রী ষড়যন্ত্রকারীদের বিশ্বাসঘাতকতার কারণে ক্লাইভের ৮শ সৈন্যসহ ৩ হাজার সৈন্যের কাছে ২৮ হাজার অশ্বারোহী এবং ৫০ হাজার পদাতিক সৈন্য নিয়েও নবাববাহিনীর অপ্রত্যাশিত পরাজয় ঘটে। জয় হয় বিশ্বাসঘাতকদের। সেই সঙ্গে বাংলার স্বাধীনতার সূর্য প্রায় দুইশ বছরের জন্য হারিয়ে যায় ঔপনিবেশিকতার আঁধারে।
পরবর্তীকালে নবাব সৈন্যদের সংগঠিত করে যুদ্ধ করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু মীরজাফরের ছেলে মীরনের নির্দেশে ১৭৫৭ সালের ২ জুন মোহাম্মদী বেগের ছুরিকাঘাতে নিহত হন সিরাজদ্দৌলা।
এরপর মসনদে বসেন মীরজাফর। পলাশী যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ হিসাবে ১ কোটি ৮০ লাখ পাউন্ড আদায় করে ইংরেজরা। একের পর এক নবাব বদল হতে থাকে। ১৭৬৪ সালে বক্সারের চূড়ান্ত যুদ্ধে বাংলার শাসনক্ষমতা দখল করে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি। ক্রমান্বয়ে গোটা ভারতবর্ষ ব্রিটিশ আধিপত্যবাদের কবলে নিপতিত হয়। ভারতবাসীকে দীর্ঘ প্রায় দুশ বছর গোলামির শৃঙ্খলে আবদ্ধ থাকতে হয়।
এরপর থেকে শোষণ-বঞ্চনার শিকার হয়ে স্বাধীনতাকামী মানুষ ক্রামাগতভাবে আন্দোলন চালিয়ে যায়। এর ফলে ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ শাসনের অবসান ঘটে। এবং ভারত ও পাকিস্তান নামে দুটি স্বাধীন রাষ্ট্র গঠিত হয়। এতেও রেহাই মেলেনি এ অঞ্চলের মানুষের। পশ্চিম পাকিস্তান দ্বারা শোষণ-বঞ্চনার শিকার হতে থাকে পূর্ব পাকিস্তানের মানুষ। আবারও শুরু হয় অধিকার আদায়ের সংগ্রাম। এরই ধারাবাহিকতায় ২৩ বছরের লড়াই শেষে পূর্ব পাকিস্তান স্বাধীন হয়। সৃষ্টি হয় নতুন রাষ্ট্র; বাংলাদেশ।
ইতিহাসের বাঁকবদলে অনেককিছুর পরিবর্তন হয়েছে, তবে নবাব সিরাজউদ্দৌলার মানুষের শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা কমেনি। আজও মানুষ লেখালেখি, আলোচনা, চলচ্চিত্র, যাত্রা, নাটকসহ নানা প্ল্যাটফর্মে তাকে স্মরণ করে। আর ধিক্কার-ঘৃণা জানায় বিশ্বাসঘাতকদের।