
মাওলানা বাকী উল্লাহ সম্পাদক কক্স২৪নিউজ।
মানুষের জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত, প্রতিটি চিন্তা এবং প্রতিটি কাজ একটি বিশাল মহাজাগতিক রেকর্ডে সংরক্ষিত হচ্ছে। ইসলামী বিশ্বাস অনুযায়ী, পৃথিবী হলো একটি পরীক্ষাগার এবং মৃত্যুর পরবর্তী জীবন হলো সেই পরীক্ষার ফলাফলের প্রতিফলন। এই অমোঘ সত্যটি আমাদের প্রতিটি পদক্ষেপে সচেতন করে তোলে যে—আল্লাহর কাছে আমাদের প্রত্যেকের নিজ নিজ কাজের হিসাব দিতে হবে।
১. হিসাবের অকাট্য প্রমাণ
কুরআন ও হাদিসের বর্ণনায় এটি স্পষ্ট যে, মানুষের কোনো কাজই আল্লাহর অগোচরে নয়। আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেছেন:
“আজ প্রত্যেক ব্যক্তিকে তার উপার্জিত কাজের প্রতিদান দেওয়া হবে। আজ কারও প্রতি কোনো জুলুম করা হবে না। নিশ্চয় আল্লাহ দ্রুত হিসাব গ্রহণকারী।” (সূরা আল-মুমিন, আয়াত ১৭)
আমাদের প্রতিটি কর্মলিপিতে লিখে রাখার জন্য নিযুক্ত আছেন সম্মানিত ফেরেশতারা (কিরামান কাতিবিন), যারা আমাদের গোপন ও প্রকাশ্য সমস্ত কর্মকাণ্ড রেকর্ড করে রাখেন।
২. কী কী বিষয়ে জবাবদিহিতা?
হাদিস শরিফে বর্ণিত হয়েছে, কিয়ামতের দিন কোনো মানুষ তার স্থান থেকে নড়তে পারবে না যতক্ষণ না তাকে পাঁচটি প্রশ্নের উত্তর দিতে হয়। আমাদের জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রই এই হিসাবের অন্তর্ভুক্ত:
জীবনকাল: জীবনটি কীভাবে ব্যয় করা হয়েছে?
যৌবনকাল: শক্তির পূর্ণ সময়টা কীভাবে অতিবাহিত করা হয়েছে?
সম্পদ: সম্পদ কোথা থেকে আয় করা হয়েছে এবং কোন পথে ব্যয় করা হয়েছে?
জ্ঞান: অর্জিত জ্ঞানের আলোকে আমল করা হয়েছে কি না?
৩. হিসাবের স্বচ্ছতা ও ন্যায়বিচার
মানুষের মনে অনেক সময় প্রশ্ন জাগে, এত মানুষের হিসাব কীভাবে হবে? আল্লাহর অসীম ক্ষমতার সামনে সময় বা স্থান কোনো বাধা নয়। কুরআনে বর্ণিত হয়েছে যে, মানুষের শরীরের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সেদিন সাক্ষ্য দেবে। আমাদের হাত, পা, এমনকি চামড়াও সেদিন আমাদের কৃতকর্মের বয়ান দেবে। কোনো কিছুই সেদিন অস্বীকার করার উপায় থাকবে না।
৪. সচেতন জীবনের জন্য করণীয়
জবাবদিহিতার এই বিশ্বাসকে সামনে রেখে জীবন সাজালে একজন মানুষের জীবনে বড় পরিবর্তন আসে:
আত্মপর্যালোচনা (মুহাসাবা): প্রতিদিন রাতে ঘুমানোর আগে নিজের কাজের খতিয়ান নেওয়া—আজ ভালো কী করলাম আর মন্দ কী হলো?
সততা ও নৈতিকতা: প্রতিটি কাজ করার সময় মনে রাখা যে, আমি কেবল মানুষের কাছে নয়, বরং পরম সত্তার কাছে দায়বদ্ধ।
তওবা ও ক্ষমা প্রার্থনা: মানুষ হিসেবে ভুল হওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু ভুল বুঝতে পেরে তাৎক্ষণিক তওবা করা এবং আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়া হলো নিজেকে পরিশুদ্ধ রাখার উপায়।
অধিকার রক্ষা: মানুষের হক বা অধিকার নষ্ট না করা। কারণ, আল্লাহর হক আল্লাহ মাফ করতে পারেন, কিন্তু মানুষের পাওনা সেদিন পরিশোধ করতেই হবে।
হিসাবের এই ধারণাটি কোনো ভীতিকর বিষয় নয়, বরং এটি জীবনের প্রতিটি কাজের পেছনে একটি অর্থ ও উদ্দেশ্য যোগ করে। যখন আমরা জানি যে, আমাদের প্রতিটি ভালো কাজের স্বীকৃতি পরম করুণাময়ের কাছে সংরক্ষিত আছে, তখন তা আমাদের ভালো কাজে উৎসাহ দেয়। আবার প্রতিটি মন্দ কাজের পরিণতির ভয় আমাদের পাপ থেকে দূরে রাখে।
পরকালের জবাবদিহিতার এই বোধই মানুষকে প্রকৃত অর্থে একজন দায়িত্বশীল, সৎ এবং কল্যাণকামী মানুষ হিসেবে গড়ে তোলে। আজকের এই দুনিয়া হলো বীজ বপনের সময়, আর হিসাবের দিন হলো ফসল কাটার দিন। তাই প্রতিটি মুহূর্ত যেন কল্যাণকর কাজে ব্যয় হয়, সেই প্রচেষ্টাই হওয়া উচিত আমাদের জীবনের মূল লক্ষ্য।