
কক্স২৪নিউজ ডেস্ক।
আজ ১১ মার্চ বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সম্মানিত আমীর ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমানের সভাপতিত্বে বিরোধীদলের সংসদীয় দলের এক সভা অনুষ্ঠিত হয়।
বুধবার সকালে জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় সভাকক্ষে অনুষ্ঠিত এ সভায় ১১ দলের নির্বাচিত সংসদ সদস্যগণ উপস্থিত ছিলেন।
সভা শেষে মাননীয় বিরোধীদলীয় নেতা সংসদ ভবনের এলডি হলে সাংবাদিকদের সামনে ব্রিফিং করেন।
ব্রিফিংকালে তিনি বলেন, আগামীকাল ১২ মার্চ ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের উদ্বোধনী অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। এ উপলক্ষে আজ বিরোধীদলের সকল সংসদ সদস্য নিয়ে আমরা বৈঠকে বসেছিলাম। জাতির প্রত্যাশা পূরণে বিরোধীদল হিসেবে এবং নির্বাচিত জাতীয় সংসদ সদস্য হিসেবে দেশ ও জাতির জন্য আমাদের ভূমিকা কী হবে— সেই বিষয়েই মূলত আমরা পরামর্শ করেছি।
তিনি বলেন, আমাদের সংসদীয় জোটের নির্বাচিত এমপিগণ আজকের সভায় উপস্থিত ছিলেন। আমরা খোলামেলা আলোচনা করেছি এবং বিভিন্ন বিষয়ে পরামর্শ নিয়েছি। আমরা চাই জাতীয় সংসদ দেশ ও জনগণের প্রত্যাশা পূরণে কার্যকর ও অর্থবহ ভূমিকা পালন করুক। ইতোমধ্যেই আমরা ঘোষণা করেছি— বিরোধীদল হিসেবে আমরা একটি দায়িত্বশীল বিরোধীদলের ভূমিকা পালন করতে চাই।
তিনি আরও বলেন, আমরা সকল বিষয়ে বিরোধিতা করব না, আবার না বুঝে কোনো সহযোগিতাও করব না। দেশ ও জাতির কল্যাণে সরকার যে সিদ্ধান্ত ও পদক্ষেপ গ্রহণ করবে, সে সব ক্ষেত্রে আমাদের সমর্থন ও সহযোগিতা থাকবে। তবে দেশ ও জাতির ক্ষতি হয়— এমন কোনো সিদ্ধান্ত বা পদক্ষেপ নেওয়া হলে আমরা আমাদের দায়িত্ব অনুযায়ী ভূমিকা পালন করব।
তিনি বলেন, প্রথমে আমরা ভুল ধরিয়ে দেব, সংশোধনের সুযোগ দেব এবং পরামর্শ দেব। যদি দেখি পরামর্শে কাজ হচ্ছে না, তাহলে আমরা প্রতিবাদ করব। প্রতিবাদেও যদি কাজ না হয়, তাহলে জনগণের অধিকারের পক্ষে আমরা দৃঢ়ভাবে দাঁড়াব। আমরা চাই প্রথম ধাপেই সমস্যার সমাধান হোক।
তিনি আরও বলেন, এটি সরকারের সদিচ্ছার ওপর নির্ভর করছে। যেহেতু তারা সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠ, তাই সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে অনেক কিছু করা সম্ভব। কিন্তু আলোচনার মাধ্যমে যৌক্তিক বিষয় বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলে সেটিই জাতির জন্য উত্তম হবে।
তিনি বলেন, এই সংসদ হঠাৎ করে এভাবে গঠিত হয়নি; এটি একটি বিশেষ প্রেক্ষাপটে হয়েছে। বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ বহুবার তার পূর্ণ মেয়াদ সম্পন্ন করতে পারেনি। স্বাধীনতার পর প্রথমবার ১৯৯১ সালে গঠিত সংসদ পূর্ণ মেয়াদ সম্পন্ন করে। এরপর ১৯৯৬, ২০০১ ও ২০০৮ সালের সংসদ পূর্ণ মেয়াদ সম্পন্ন করতে সক্ষম হয়। কিন্তু অন্য অনেক সংসদ জনগণের গ্রহণযোগ্যতা পায়নি এবং তাদের নৈতিক বৈধতাও প্রশ্নবিদ্ধ ছিল।
তিনি বলেন, এই নির্বাচন মূলত ২০২৬ সালে হওয়ার কথা ছিল না। সংবিধান অনুযায়ী এটি ২০২৯ সালে হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ২০২৪ সালের ঘটনার প্রেক্ষাপটে এই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে।
তিনি বলেন, ২০২৪ সালের আন্দোলন সীমাহীন ত্যাগ-তিতিক্ষা, অসংখ্য শহীদ, আহত ও পঙ্গুত্ববরণকারীদের আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে সংঘটিত হয়েছে। দীর্ঘ সাড়ে ১৫ বছরের সংগ্রাম, নির্যাতন, গুম-খুন, কারাবরণ, আয়নাঘর এবং দেশান্তরের মতো বহু কষ্টের বিনিময়ে এ পরিবর্তন এসেছে।
তিনি বলেন, আমরা যেমন ১৯৪৭, ১৯৫২, ১৯৭১ এবং ১৯৯০ সালের ঐতিহাসিক বাঁকবদলগুলোকে ধারণ করি, তেমনি ২০২৪ সালের ঘটনাকেও আমরা গভীরভাবে ধারণ করি।
তিনি বলেন, স্বাধীনতার পরও এ দেশের মানুষ প্রকৃত স্বাধীন নাগরিক হিসেবে তাদের অধিকার ভোগ করতে পারেনি। বারবার স্বৈরশাসন জাতির ঘাড়ে চেপেছে, দুঃশাসন ও দুর্নীতির কারণে সাধারণ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, কর্মক্ষেত্রে বৈষম্য তৈরি হয়েছে এবং মানুষের অধিকার খর্ব হয়েছে।
তিনি বলেন, তাই জুলাই আন্দোলন বলেছিল, “উই ওয়ান্ট জাস্টিস।” আমরা সকল ক্ষেত্রে সুবিচার চাই এবং একটি বৈষম্যহীন সমাজ গড়তে চাই।
তিনি বলেন, এ লক্ষ্যকে সামনে রেখেই এবারের জাতীয় নির্বাচনের পাশাপাশি আরেকটি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে— একটি সংসদ নির্বাচন এবং অন্যটি সংস্কার নির্বাচন। যে অর্ডিন্যান্সের মাধ্যমে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে, সেই একই অর্ডিন্যান্সের আওতায় জনগণের মতামতের ভিত্তিতে সংস্কার পরিষদ গঠনের ব্যবস্থাও করা হয়েছে।
তিনি বলেন, ফলাফল আপনারা দেখেছেন। দেশের বৃহত্তর স্বার্থে আমরা সেই ফলাফল মেনে নিয়েছি।
তিনি বলেন, এই দুটি নির্বাচন একে অপরের পরিপূরক। প্রথমে সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন শুরু হবে। নির্ধারিত মেয়াদ শেষে তারাই আবার সংসদ সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। এ কারণেই একই অর্ডিন্যান্সের প্রতি সম্মান রেখে আমরা প্রথম দিন দুটি শপথ গ্রহণ করেছি— প্রথমে সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে এবং পরে সংসদ সদস্য হিসেবে।
তবে দুঃখজনকভাবে এখন পর্যন্ত সরকারি দলের সদস্যরা প্রথম শপথটি গ্রহণ করেননি। আমরা তাদের প্রতি আহ্বান জানাই— আসুন, জুলাইয়ের আত্মত্যাগকে সম্মান করি।
তিনি বলেন, জুলাইকে সম্মান করলেই ২০২৪-এর চেতনা বেঁচে থাকবে এবং ২০২৬ অর্থবহ হবে। ২০২৪-এর চেতনাকে অস্বীকার করলে ২০২৬-এর অস্তিত্বও প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়বে।
তিনি বলেন, মনে রাখতে হবে— বাংলাদেশে যারা ভোট দিয়েছেন, তাদের প্রায় ঊনসত্তর শতাংশ এ প্রক্রিয়ার পক্ষে রায় দিয়েছেন। এটিকে অগ্রাহ্য করার কোনো সুযোগ নেই।
তিনি বলেন, গণভোটে যে চারটি বিষয় উত্থাপিত হয়েছিল, আমরা চাই সেগুলো হুবহু গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করা হোক। এ বিষয়ে আমাদের সর্বাত্মক সহযোগিতা থাকবে।
তিনি আরও বলেন, আমরা আগেই বলেছি— বিরোধিতার জন্য বিরোধিতা করব না। সহযোগিতা করলে তা হবে দেশ ও জনগণের কল্যাণে, আর বিরোধিতা করলে সেটিও হবে দেশ ও জনগণের অধিকারের পক্ষে। প্রয়োজনে সংসদের ভেতরে আমরা লড়াই করব, প্রয়োজন হলে রাজপথেও করব। এটিই গণতন্ত্রের সৌন্দর্য।
তিনি বলেন, আমরা হুটহাট করে আদালতে যাওয়ার পক্ষে নই। একান্ত প্রয়োজন হলে তবেই আদালতের আশ্রয় নেব।
তিনি আরও বলেন, আমরা প্রত্যাশা করি সংসদের স্পিকার নিরপেক্ষ ও ন্যায়সঙ্গত ভূমিকা পালন করবেন এবং বিরোধীদলকে যথেষ্ট সুযোগ দেবেন। তাহলে গণতন্ত্রের সৌন্দর্য ফুটে উঠবে এবং গণতন্ত্র টেকসই হবে।
তিনি আশা প্রকাশ করেন, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের মাধ্যমে বাংলাদেশ একটি কার্যকর ও টেকসই গণতন্ত্রের পথে এগিয়ে যাবে।
তিনি বলেন, দায়িত্বশীল বিরোধীদল হিসেবে ১১ দলের নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা যেন তাদের দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করতে পারেন— সে জন্য তিনি সকলের দোয়া ও সহযোগিতা কামনা করেন।
তিনি দেশবাসীর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বলেন, জনগণ যে রায় দিয়েছেন এবং যে পরিমাণ সমর্থন দিয়েছেন, তার জন্য আমরা কৃতজ্ঞ।
তিনি বলেন, দেশের বাইরে যারা আছেন, তারা আমাদের আত্মার অংশ। জুলাইয়ের পরিবর্তন, ৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ, ৯০-এর গণআন্দোলন— সকল ক্ষেত্রেই তাদের আন্তরিক সম্পৃক্ততা ছিল। বিশেষ করে জুলাইয়ের উত্তাল দিনগুলোতে শুধু বাংলাদেশ উত্তাল ছিল না; প্রবাসীরা দুনিয়ার যে যেখানে ছিলেন, তারা সম্পৃক্ত হয়ে গিয়েছিলেন। রেমিট্যান্স বন্ধ করে দিয়েছিলেন। এমন অনেক দেশ আছে যেখানে রাস্তায় নেমে মিছিল করা যায় না; তারা সেই বিধিনিষেধ ভুলে গিয়ে দেশের পক্ষে মিছিল করেছেন। কারাগারে নিক্ষিপ্ত হয়েছেন। তাদের ওপর শাস্তি আরোপ করা হয়েছে। আমরা তাদের এই ভূমিকাকে শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করি।
তিনি আরও বলেন, প্রবাসীদের ভোটাধিকার নিশ্চিত করার দাবি প্রথম আমরাই তুলেছিলাম। এখন তার আংশিক বাস্তবায়ন হয়েছে এবং ভবিষ্যতে এটি আরও বিস্তৃত হবে বলে আমরা আশা করি।
তিনি বলেন, প্রবাসীরা আমাদের রেমিট্যান্স যোদ্ধা। তাদের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করতে আমরা সংসদের মাধ্যমে সংগ্রাম চালিয়ে যাব।
তিনি আরও বলেন, বিদেশে কোনো প্রবাসী বাংলাদেশি ইন্তিকাল করলে তার লাশ দেশে আনার ব্যয় সরকার বহন করবে— এ দাবি প্রথম আমরাই তুলেছিলাম। ইতোমধ্যে সরকার এ বিষয়ে উদ্যোগ নিয়েছে। এজন্য আমরা সরকারকে ধন্যবাদ ও অভিনন্দন জানাই।
তিনি বলেন, ইতোমধ্যে সরকারের পক্ষ থেকে প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় খোলার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। সরকার যদি জনগণের কল্যাণে এ ধরনের উদ্যোগ গ্রহণ করে, আমরা অবশ্যই তা স্বাগত জানাব।
তিনি বলেন, আমরা দেশের মানুষের কল্যাণে যে দাবিগুলো ইতোমধ্যেই করেছি, সরকার যদি তা বাস্তবায়ন করতে থাকে— তাহলে এভাবেই আমরা তাদেরকে অভিনন্দন জানাতে থাকব।
আমি আশা প্রকাশ করছি, দুর্নীতি ও দুঃশাসনের করাল গ্রাস থেকে বাংলাদেশ মুক্ত হবে এবং জুলাইয়ের আকাঙ্ক্ষাকে ধারণ করে সরকার তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করবে।
পরিশেষে সবাইকে নিয়ে একটি নিরাপদ, মানবিক, দুর্নীতি ও দুঃশাসনমুক্ত বাংলাদেশ গড়ে তোলার প্রত্যয় ব্যক্ত করে তিনি তাঁর বক্তব্য শেষ করেন।