
কক্স২৪নিউজ ডেস্ক।
১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে এক ব্যর্থ সেনা অভ্যুত্থানে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের মর্মান্তিক মৃ.ত্যু বেগম জিয়ার জীবনের সব আলো নিভিয়ে দেয়।
জিয়াউর রহমানের শাহাদাতের পর বিএনপি যখন অস্তিত্ব সংকটে, দলে ভাঙন, ষড়যন্ত্র এবং নেতৃত্বের কোন্দল চরমে, ঠিক তখনই দলের প্রবীণ নেতা ও কর্মীদের অনুরোধে তিনি ঘর ছেড়ে রাজপথে নামেন।
১৯৮২ সালের ৩ জানুয়ারি তিনি বিএনপির প্রাথমিক সদস্য হন এবং ১৯৮৩ সালে দলের হাল ধরেন।
স্বামী হারানোর শোককে শক্তিতে রূপান্তর করে তিনি টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া চষে বেড়ান।
যে নারী একসময় জনসমক্ষে কথা বলতে সংকোচ বোধ করতেন, তিনিই হয়ে ওঠেন কোটি জনতার কণ্ঠস্বর।
১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম নিরপেক্ষ নির্বাচনে বিএনপি একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে।
বেগম খালেদা জিয়া বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথম এবং মুসলিম বিশ্বের দ্বিতীয় নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন।
সরকার গঠনের পর তিনি দেশের রাজনৈতিক কাঠামোতে আমূল পরিবর্তন আনেন।
রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকার ব্যবস্থা পরিবর্তন করে তিনি দেশকে সংসদীয় গণতন্ত্রে ফিরিয়ে আনেন, যা গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখে।
তার শাসনামলে (১৯৯১-১৯৯৬ এবং ২০০১-২০০৬) বাংলাদেশ আর্থ-সামাজিকখাতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন দেখে।
তিনি বিশ্বাস করতেন, “শিক্ষাই জাতির মেরুদণ্ড এবং নারীরাই উন্নয়নের চাবিকাঠি।”
এই দর্শনের আলোকে তিনি দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত মেয়েদের অবৈতনিক শিক্ষা ও উপবৃত্তি চালু করেন, যার ফলে আজ বাংলাদেশের প্রতিটি ঘরে শিক্ষিত নারী দেখা যায়।
তার আমলেই যমুনা বহুমুখী সেতু নির্মাণ কাজ শুরু ও সম্পন্ন হয়, যা উত্তরবঙ্গের সাথে সারা দেশের যোগাযোগ স্থাপন করে অর্থনীতির চাকা ঘুরিয়ে দেয়।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার উত্তাল গণঅভ্যুত্থানে যখন দীর্ঘ ১৬ বছরের স্বৈরাচারী শেখ হাসিনা সরকারের পতন ঘটে এবং তিনি দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান, তখন বেগম খালেদা জিয়া এভারকেয়ার হাসপাতালের বিছানায় চিকিৎসাধীন।
হাসিনার পলায়নের পরদিনই, ৬ আগস্ট রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের আদেশে তাকে নিঃশর্ত মুক্তি দেওয়া হয়।
এর মাধ্যমে অবসান ঘটে তার দীর্ঘ ৬ বছরের কারাবাস ও কার্যত গৃহবন্দিত্বের।
যে নেত্রীকে তিলে তিলে শেষ করার জন্য ‘মাদার অফ ডেমোক্রেসি’ থেকে ‘সাজাপ্রাপ্ত কয়েদি’ বানানোর চেষ্টা করা হয়েছিল, ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে তিনি মুক্ত হলেন বীরের বেশে, আর তার নির্যাতনকারীকে দেশ ছেড়ে পালাতে হলো।
হাসিনার পলায়ন এবং আওয়ামী লীগের পতনের খবর শুনে তিনি মহান আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করেন, তবে তার মধ্যে কোনো বিজয়োল্লাস বা প্রতিপক্ষকে দমনের মানসিকতা দেখা যায়নি।
বরং বিজয়ের পর তিনি দেখিয়েছিলেন এক অসাধারণ রাষ্ট্রনায়কোচিত উদারতা।
মুক্তির পর ৭ আগস্ট নয়াপল্টনে বিএনপির ঐতিহাসিক সমাবেশে হাসপাতাল থেকে ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে তিনি যে বক্তব্য দিয়েছিলেন, তা ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।
দীর্ঘদিনের নির্যাতন ও অবিচারের শিকার হয়েও তিনি বলেছিলেন, “ধ্বংস নয়, প্রতিশোধ নয়, প্রতিহিংসা নয়, আসুন ভালোবাসা আর শান্তির সমাজ গড়ে তুলি। এই বিজয় আমাদের নতুন সম্ভাবনা নিয়ে এসেছে। দীর্ঘদিনের নজিরবিহীন দুর্নীতি ও গণতন্ত্রের ধ্বংসস্তূপ থেকে আমাদের এক সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তুলতে হবে।”
তার এই বক্তব্য প্রমাণ করেছিল যে, তিনি কেবল ক্ষমতার জন্য রাজনীতি করেননি, বরং তিনি ছিলেন প্রতিহিংসার ঊর্ধ্বে থাকা এক মহৎপ্রাণ নেত্রী।