
চট্টগ্রাম মহানগর প্রতিনিধি।
২০১২ সালের ৯ জানুয়ারি চট্টগ্রামের পলোগ্রাউন্ড মাঠে সর্বশেষ জনসভা করেছিলেন বিএনপির সাবেক চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। বিএনপি দাবি করে আসছে, সেই জনসভায় ১৫ লাখ থেকে ১৬ লাখ মানুষের সমাগম ঘটেছিল। দীর্ঘ দুই দশকেরও বেশি সময় পর আজ রোববার সকাল ১০টায় একই মাঠে বিএনপি আয়োজিত এক নির্বাচনী মহাসমাবেশে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখবেন দলটির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। তার এই সমাবেশেও একইভাবে জনসমাগম ঘটাতে চায় চট্টগ্রাম বিএনপি। এ জন্য ব্যাপক প্রস্তুতি নেওয়া হয়।
ইতোমধ্যে দুই দফায় চট্টগ্রাম সফর করে গেছেন জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান। নির্বাচনকে সামনে রেখে আগামী ২ ফেব্রুয়ারি তৃতীয়বারের মতো চট্টগ্রাম আসতে যাচ্ছেন তিনি। ফলে তার এই সফরের আগে তারেক রহমানের মহাসমাবেশ চট্টগ্রাম বিএনপির জন্য প্রেস্টিজ ইস্যু হয়ে ওঠে। সংশ্লিষ্ট বিএনপি নেতারা আশা করছেন, যেভাবে প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে, তাতে মহাসমাবেশে ১০ লাখ থেকে ১৫ লাখ মানুষের সমাগম ঘটবে। চট্টগ্রাম উত্তর, দক্ষিণ ও মহানগর বিএনপি যৌথ উদ্যোগে এই মহাসমাবেশের আয়োজন করছে।
গত ২২ নভেম্বর জিইসি কনভেনশন সেন্টারে এক দায়িত্বশীল সম্মেলনে দলীয় প্রার্থীদের পরিচয় করিয়ে দেন জামায়াত আমির ডা. শফিকুর রহমান। আজ বিএনপির মহাসমাবেশে চট্টগ্রামের ১৬ আসনে দল মনোনীত প্রার্থীদের পরিচয় করিয়ে দেবেন তারেক রহমান। ধানের শীষ প্রতীকে সাধারণ মানুষের কাছে ভোট চাওয়ার পাশাপাশি দলের নেতাকর্মীদের প্রতি ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার কঠোর নির্দেশনাও দেবেন তিনি।
গতকাল শনিবার রাতে ঢাকা থেকে ফ্লাইটে করে চট্টগ্রামে আসেন তারেক রহমান। নগরীর র্যাডিসন ব্লুতে রাতযাপন করেন তিনি। সকাল ১০টায় পলোগ্রাউন্ড মাঠে জমায়েত হবে। বেলা ১১টা থেকে সাড়ে ১১টার মধ্যে সমাবেশে বক্তব্য রাখবেন তিনি। এর আগে র্যাডিসন ব্লুতে ছাত্র প্রতিনিধিদের সঙ্গে সংক্ষিপ্ত এক মতবিনিময় সভা করার কথা রয়েছে তার। এছাড়া মঞ্চের পাশে ‘জুলাইযোদ্ধাদের’ বসার ব্যবস্থা করা হয়েছে। মঞ্চে আসন গ্রহণের আগে তাদের সঙ্গে কুশল বিনিময় করবেন।
এদিকে বিএনপি নেতাকর্মীরা চট্টগ্রামের পলোগ্রাউন্ড মাঠে তারেক রহমানের মহাসমাবেশকে গতানুগতিক কোনো সমাবেশ বলতে চান না। সর্বস্তরের সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণের মাধ্যমে সমাবেশটিকে ভিন্নতর করতে চান তারা। এ জন্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকা থেকে গাড়িতে করে সাধারণ মানুষকেও নিয়ে সমাবেশে নিয়ে আসা হবে।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীর নেতৃত্বে চট্টগ্রাম সিটি মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেনসহ চট্টগ্রামের তিন সাংগঠনিক জেলার বিএনপির সিনিয়র নেতারা তারেক রহমাানের সমাবেশ সফলে কয়েক দিন ধরে ব্যাপক প্রস্তুতি নেন। চট্টগ্রামের ১৬ আসনের প্রার্থীসহ তিন সাংগঠনিক জেলার নেতৃবৃন্দকে নিয়ে প্রস্তুতি সভা করা হয়। এতে লোক সমাগমের কৌশল ও পরিকল্পনা করা হয়। এলাকার বিএনপি ও অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মীদের সঙ্গে সমন্বয় করে লোকজনকে সমাবেশে নিয়ে আসার দায়িত্ব দেওয়া হয়। নির্বাচনী প্রচারণার পাশাপাশি প্রার্থীরাও তারেক রহমানের সমাবেশ সফলে মাঠ পর্যায়ে ব্যাপক প্রস্তুতি নেন। বিশেষ করে প্রার্থীদের পক্ষ থেকে বড় ধরনের শোডাউন করা হবে এই সমাবেশে।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী সমকালকে বলেন, ‘চট্টগ্রামের পলোগ্রাউন্ড মাঠে বিএনপি আয়োজিত তারেক রহমানের সমাবেশটি হবে অন্য যে কোনো সমাবেশের চেয়ে আলাদা এবং ব্যতিক্রম। সাধারণ দলীয় সমাবেশগুলোতে দলের লোকজনই অংশ গ্রহণ করে থাকেন। কিন্তু এবার তারেক রহমান নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে যে আগ্রহ তৈরি হয়েছে, তাতে বিপুলসংখ্যক সাধারণ মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে সমাবেশে যোগ দেবেন। তাই বিএনপি ও তারেক রহমানের প্রতি মানুষের ভালোবাসার অন্যতম একটি উদাহরণ হয়ে থাকবে চট্টগ্রামের এই সমাবেশ।
চট্টগ্রামে বিএনপির তিন সাংগঠনিক জেলা চট্টগ্রাম উত্তর, দক্ষিণ ও মহানগরে কমবেশি সাংগঠনিক সমস্যা রয়েছে। বিভিন্ন পর্যায়ে দলটির কার্যক্রম চলছে একবারে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে। অনেক ইউনিটে ভেঙে পড়েছে দলটির চেইন অব কমান্ড।
এটা যাতে নির্বাচনে প্রভাব না পড়ে সেজন্য মাঠ পর্যায়ে কাজ করছেন দলের দায়িত্বপ্রাপ্ত বিএনপি নেতারা। আর বিভক্ত নেতাকর্মিদের মান-অভিমান ভুলে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার বার্তা দেবেন তরেক রহমান।
অবশ্য চট্টগ্রাম বিএনপির একাধিক সিনিয়র নেতা জানিয়েছেন, আপাতত নির্বাচনকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিচ্ছেন তারেক রহমান। এজন্য বিভক্ত নেতাকর্মিদের এক ছাতার নিচে নিয়ে আসার চেষ্টা করছেন। আবার যাদের মনোনয়ন দেওয়া যায়নি, ক্ষমতায় যাওয়ার সুযোগ এলে তাদের মূল্যায়ণের আশ^াস দিচ্ছেন তিনি। একইসঙ্গে প্রতিপক্ষের প্রার্থীদের মোকাবেলায় জনগণের নজর কাড়তে করণীয় সবকিছুই করছেন। নির্বাচনের পর দলকে ঢেলে সাজাতে কাজ করবেন তিনি।
চট্টগ্রাম সিটি মেয়র ও নগর বিএনপির সাবেক সভাপতি ডা. শাহাদাত হোসেন সমকালকে বলেন, ‘বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান নির্বাচনকে সামনে রেখেই চট্টগ্রাম সফর করছেন। তিনি দলের প্রার্থীদের জয়ী করতে সব ভেদাভেদ ভুলে নেতাকর্মিদের কাজ করার নির্দেশনা দিয়েছেন। বিষয়টি নিয়ে তিনি বেশ কঠোর ও অটল।’ তিনি বলেন, ‘চট্টগ্রামের পলোগ্রাউন্ড মাঠে যখন খালেদা জিয়ার সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়, তখন নগর বিএনপির সভাপতি ছিলেন আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী এবং সাধারণ সম্পাদক ছিলাম আমি। সেই সমাবেশে প্রায় ১৬ লাখ মানুষের সমাগম ঘটেছিল। এবার তারেক রহমানের সমাবেশেও একই ধরনের লোক সমাগম হবে বলে আমার আশা করছি এবং আমরা সেভাবে প্রস্তুতি নিয়েছি।’
এদিকে আগামী নির্বাচনকে সামনে রেখে কয়েক মাস আগে থেকেই প্রচারণা চালিয়ে আসছেন জামায়াত ইসলামী মনোনীত প্রার্থীরা। আগেভাগেই তারা প্রস্তুত করে রাখেন কেন্দ্রভিত্তিক নির্বাচন পরিচালনা কমিটি। তালিকা করে রেখেছেন প্রার্থীদের এজেন্টদের। চট্টগ্রাম ঘুরে গেছেন দলটির আমীর ডা. শফিকুর রহমানও। স্বাভাবিকভাবে আগে থেকেই নির্বাচনী প্রস্তুতির বড় অংশই সেরে রেখেছেন তারা। তবে আনুষ্ঠানিক প্রচারণার শুরুতেই বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের বড়সর সমাবেশের মাধ্যমে মুল প্রতিদ্বন্দ্বি দল জামায়াতকে টেক্কা দিতে চায় বিএনপি। মুলত এজন্য চট্টগ্রামে তারেক রহমানের সমাবেশকে অন্য মাত্রায় নিয়ে যেতে চান বিএনপি নেতাকর্মিরা।
এ ব্যাপারে শনিবার বিকেলে নগর বিএনপির সদস্য সচিব নাজিমুর রহমান সমকালকে বলেন, ‘চট্টগ্রামে তারেক রহমানের সমাবেশ সফলে বহুমাত্রিক ও ব্যাপক প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হয়েছে। সকাল ১০টায় জমায়েত হলেও, এরও আগে থেকে থেকে চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকা থেকে দলের নেতাকর্মিরা সমাবেশে যোগ যোগ দেবেন। এই সমাবেশ জনসুমদ্রে পরিণত হবে।’
চট্টগ্রামকে বাণিজ্যিক রাজধানী করার কথা শুনাবেন তারকে রহমান
তারেক রহমান স্বদেশ প্রত্যাবর্তন করেই বলেছিলেন ‘আই হ্যাভ এ প্ল্যান’। দেশ নিয়ে তিনি তার বিভিন্ন পরিকল্পনার কথা তুলে ধরছেন। এবার চট্টগ্রাম নিয়ে তার পরিকল্পনার কথা শুনাবেন বিএনপির এই শীর্ষ নেতা।
বিএনপি নেতারা জানিয়েছেন, চট্টগ্রাম হচ্ছে দেশের অর্থনীতির হৃদপিন্ড। কিন্তু চট্টগ্রামে সেভাবে উন্নয়ন করা হয়নি। বিএনপি ক্ষমতায় গেলে বাণিজ্যিক রাজধানী হিসেবে চট্টগ্রামকে কীভাবে ঢেলে সাজাবেন, তার বক্তব্যে সে ধরনের পরিকল্পনাও থাকতে পারে। চট্টগ্রামের সর্বস্তরের মানুষও তার মুখ থেকে চট্টগ্রাম নিয়ে উন্নয়নের পরিকল্পনা শুনতে চান। তারেক রহমান এ নিয়ে তার পরিকল্পনার বিষয়টি তুলে ধরতে পারেন। তারা জানান, শুধু বাণিজ্যিক রাজধানী হিসেবেই নয়, বন্দর নগরী হিসেবেও চট্টগ্রামের গুরুত্ব অনুধাবন করে চট্টগ্রাম অঞ্চলের উন্নয়ন নিয়ে তার বিশেষ পরিকল্পনা রয়েছে। সমাবেশে এটা নিয়েও তিনি কথা বলবেন।