কক্স২৪ নিউজ ডেস্ক।
ইসলামী হিজরি সনের প্রথম মাস মহররম। এ মাসের ১০ তারিখকে আশুরা বলা হয়। আরবি ‘আশারা’ শব্দ থেকে আশুরা শব্দের উৎপত্তি, যার অর্থ ‘দশ’। ইসলামের ইতিহাসে এ দিনটি অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ ও তাৎপর্যপূর্ণ। যুগে যুগে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা এ দিনের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়েছে। তবে এ বিষয়টি মনে রাখা জরুরি যে, আশুরার সঙ্গে সম্পর্কিত সব ঘটনা সমানভাবে নির্ভরযোগ্য নয়। কিছু ঘটনা সহীহ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত, আবার কিছু ঘটনা ঐতিহাসিক বর্ণনা ও তাফসির গ্রন্থে উল্লেখিত হলেও সেগুলোর সনদ দুর্বল বা বিতর্কিত।
ইসলামের আবির্ভাবের পূর্ব থেকেই আরব সমাজে আশুরার দিনটি পরিচিত ছিল। জাহেলি যুগে কুরাইশরা এ দিনে রোজা রাখত। পরবর্তীতে মুহাম্মদ (সা.) নবুওয়াত লাভের পরও এ রোজা পালন করেন। হিজরতের পর মদীনায় এসে তিনি ইহুদিদেরও আশুরার রোজা পালন করতে দেখেন।
ইহুদিরা জানায়, এ দিন আল্লাহ তাআলা মুসা (আ.) ও বনি ইসরাইলকে ফিরআউন-এর অত্যাচার থেকে মুক্তি দিয়েছিলেন। তখন রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন:
"আমরা মুসা (আ.)-এর অনুসরণে তোমাদের চেয়ে অধিক হকদার।"
অতঃপর তিনি নিজেও আশুরার রোজা রাখেন এবং সাহাবিদের রোজা রাখার নির্দেশ দেন।
আশুরার সঙ্গে সম্পৃক্ত সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ও সহীহ সূত্রে বর্ণিত ঘটনা হলো মুসা (আ.)-এর বিজয় এবং বনি ইসরাইলের মুক্তি।
দীর্ঘদিন ধরে ফিরআউন বনি ইসরাইলের ওপর নির্যাতন চালিয়ে আসছিল। আল্লাহ তাআলা মুসা (আ.)-কে নবী হিসেবে প্রেরণ করেন এবং তাঁকে বনি ইসরাইলকে মুক্ত করার দায়িত্ব দেন।
ফিরআউনের অবাধ্যতা ও অত্যাচারের একপর্যায়ে আল্লাহর নির্দেশে মুসা (আ.) তাঁর সম্প্রদায়কে নিয়ে মিসর ত্যাগ করেন। ফিরআউন বিশাল বাহিনী নিয়ে তাদের পিছু নেয়। যখন উভয় দল সমুদ্রের তীরে পৌঁছে যায়, তখন আল্লাহর নির্দেশে মুসা (আ.) তাঁর লাঠি সমুদ্রে আঘাত করলে সমুদ্র দ্বিখণ্ডিত হয়ে যায়। মুসা (আ.) ও তাঁর অনুসারীরা নিরাপদে পার হয়ে গেলেও ফিরআউন ও তার বাহিনী সাগরে ডুবে ধ্বংস হয়।
এই ঘটনাকে স্মরণ করেই আশুরার রোজা পালনের প্রচলন শুরু হয়।
আশুরার দিনের সঙ্গে জড়িত ইসলামের ইতিহাসের সবচেয়ে বেদনাদায়ক অধ্যায় হলো কারবালার ঘটনা।
৬১ হিজরির ১০ মহররম (১০ অক্টোবর ৬৮০ খ্রিষ্টাব্দ) ইরাকের কারবালার প্রান্তরে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর প্রিয় দৌহিত্র ইমাম হুসাইন (রা.), তাঁর পরিবারের সদস্য এবং সঙ্গীরা শাহাদাত বরণ করেন।
তৎকালীন রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে কুফাবাসীর আমন্ত্রণে ইমাম হুসাইন (রা.) কুফার উদ্দেশে রওনা হন। কিন্তু কারবালায় পৌঁছানোর পর তিনি ও তাঁর সঙ্গীরা অবরুদ্ধ হন। দীর্ঘ অবরোধ ও পানির সংকটের মধ্যেও তিনি অন্যায়ের কাছে মাথা নত করেননি। অবশেষে ১০ মহররম তিনি ও তাঁর অধিকাংশ সঙ্গী শাহাদাত বরণ করেন।
কারবালার ঘটনা মুসলিম উম্মাহর জন্য সত্য, ন্যায়, আদর্শ ও আত্মত্যাগের এক অবিস্মরণীয় শিক্ষা।
ইসলামী ঐতিহ্যের বিভিন্ন গ্রন্থে আরও কিছু ঘটনা আশুরার দিনের সঙ্গে সম্পৃক্ত বলে উল্লেখ রয়েছে। তবে এসব ঘটনার অনেকগুলোর সনদ দুর্বল।
কিছু বর্ণনায় এসেছে, এ দিন আল্লাহ তাআলা আদম (আ.)-এর তওবা কবুল করেন।
ঐতিহাসিক বর্ণনা অনুযায়ী, মহাপ্লাবনের পর নুহ (আ.)-এর নৌকা জুদি পর্বতে এসে থামে।
কিছু বর্ণনায় উল্লেখ করা হয়েছে যে, আল্লাহ তাআলা এ দিন ইবরাহিম (আ.)-কে নমরুদের অগ্নিকুণ্ড থেকে রক্ষা করেন।
বর্ণিত আছে, ইউনুস (আ.) মাছের পেট থেকে এ দিনে মুক্তি লাভ করেন।
কিছু তাফসির গ্রন্থে এ ঘটনাও আশুরার দিনের সঙ্গে সম্পৃক্ত বলে উল্লেখ রয়েছে।
সহীহ হাদীসে আশুরার রোজার বিশেষ ফজিলত বর্ণিত হয়েছে। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, আশুরার রোজা পূর্ববর্তী এক বছরের সগিরা গুনাহের কাফফারা হওয়ার আশা করা যায়।
আশুরার দিনে করণীয়
আশুরা মুসলিম উম্মাহর জন্য এক অনন্য শিক্ষা ও অনুপ্রেরণার দিন। এ দিন আমাদের আল্লাহর প্রতি আনুগত্য, সত্যের প্রতি অবিচলতা এবং ত্যাগের মহান আদর্শ স্মরণ করিয়ে দেয়।
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক : মোঃ বাকী উল্লাহ
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত