শেখ আহমদ মিরাজ স্পোর্টস সম্পাদক।
ম্যাচের দিনই প্রবেশ, খেলা শেষেই যুক্তরাষ্ট্র ছাড়তে হবে ইরানকে। যুক্তরাষ্ট্রে নিজেদের ম্যাচগুলোর দিনই শুধু দেশটিতে প্রবেশ করতে পারবে ইরান। খেলা শেষেই দ্রুত সীমান্ত ত্যাগ করার এক নজিরবিহীন ও কঠোর নিয়ম মানতে বাধ্য করা হচ্ছে।
ফুটবল আর রাজনীতি মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ যেন! মাঠের লড়াই শুরুর আগেই ২০২৬ বিশ্বকাপ জড়িয়ে গেল বড় ধরনের কূটনৈতিক দ্বন্দ্বে। এবার বৈরি রাজনীতির নির্মম শিকার ইরান।
গোল ডটকমের প্রতিবেদন, যুক্তরাষ্ট্রে নিজেদের ম্যাচগুলোর দিনই শুধু দেশটিতে প্রবেশ করতে পারবে ইরান। খেলা শেষেই দ্রুত সীমান্ত ত্যাগ করার এক নজিরবিহীন ও কঠোর নিয়ম মানতে বাধ্য করা হচ্ছে ‘টিম মেল্লিকে’। চরম ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা ও নিরাপত্তা ঝুঁকির অজুহাতে ট্রাম্প প্রশাসনের তরফ থেকে ইরান দলকে এই কড়া নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য মিররের এক প্রতিবেদনে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এসেছে। নির্দেশনানুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে খেলা থাকার দিন সকালে সীমান্ত পার হয়ে ভেন্যুতে প্রবেশ করতে পারবে শুধু ইরান ফুটবল দল, আর ম্যাচের শেষ বাঁশি বাজার পরপরই তাদের আমেরিকার মাটি ছাড়তে হবে।
বিশ্বকাপ ইতিহাসের এই লজিস্টিক জটিলতা নিয়ে মেক্সিকোতে নিযুক্ত ইরানের রাষ্ট্রদূত আবুলফজল পাসান্দিদেহ সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমরা কেবল ম্যাচের দিন সকালে (যুক্তরাষ্ট্রে) প্রবেশ করতে পারব এবং খেলা শেষেই আমাদের ওই দিন চলে যেতে হবে।’
এমন বৈরি ও বৈষম্যমূলক পরিস্থিতির কারণে ইরান দল যুক্তরাষ্ট্রে তাদের পূর্বনির্ধারিত বেস ক্যাম্প বাতিলের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। অ্যারিজোনার টুসন শহরের ক্যাম্প বাতিল করে এখন তারা মেক্সিকোকে বিশ্বকাপ সদর দপ্তর বানাতে বাধ্য হয়েছে।
ইরান দলের ওপর এমন কঠোর নিয়ম চাপানোর পেছনে মার্কিন প্রশাসনের পক্ষ থেকে মারাত্মক সব অভিযোগ তোলা হয়েছে। যদিও খেলোয়াড় ও কোচিং স্টাফদের টুর্নামেন্টে অংশ নেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় ক্রীড়া ভিসা দেওয়া হয়েছে, তবুও মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্ট তাদের এই কড়া নজরদারির পক্ষে সাফাই গেয়েছে।
স্টেট ডিপার্টমেন্টের একজন কর্মকর্তা বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেছেন, ‘ক্রীড়াবিদ এবং প্রয়োজনীয় সহকারী স্টাফসহ ইরানের বিশ্বকাপে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার জন্য প্রয়োজনীয় ভিসা ইস্যু করা হয়েছে।’
তবে এর পরপরই ইরানি প্রতিনিধি দলের দিকে সরাসরি অভিযোগের আঙুল তুলে ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘আমরা ইরানি দলকে এই ব্যবস্থার অপব্যবহার করতে দেব না, যাতে তারা কোনো মিথ্যা অজুহাতে যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরে সন্ত্রাসী ঢুকিয়ে দিতে পারে।’
যুক্তরাষ্ট্র সরকার ইরানকে রাতে অবস্থানের অনুমতি না দেওয়ায়, গ্রুপ পর্বের দিনগুলোতে তাদের নিরাপদ আশ্রয়ের ব্যবস্থা করেছে যৌথ আয়োজক মেক্সিকো। এর আগে ইরান তাদের ম্যাচগুলো পুরোপুরি মেক্সিকোর মাটিতে সরিয়ে নেওয়ার জন্য ফুটবলের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফার কাছে লবিং করেছিল। কিন্তু ফিফা সেই অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করায় বাধ্য হয়েই এই 'ক্রস-বর্ডার কমিউটিং' বা সীমান্ত পারাপারের অদ্ভুত নিয়ম মেনে নিতে হচ্ছে ইরানকে।
এই জটিল পরিস্থিতিতে ইরানের পাশে দাঁড়িয়েছেন মেক্সিকোর প্রেসিডেন্ট ক্লাউডিয়া শিনবাউম। বিষয়টিকে ইতিবাচকভাবে স্বাগত জানিয়ে তিনি বলেন, ‘তাদের মেক্সিকোতে থাকার সুযোগ অস্বীকার করার কোনো কারণ আমাদের নেই। যুক্তরাষ্ট্র চায় না ইরান দল সেখানে রাত কাটাক, অথচ তারা সেখানে তিনটি ম্যাচ খেলবে। তাই তারা আমাদের জিজ্ঞেস করেছিল, তারা কি মেক্সিকোতে রাত কাটাতে পারে?' আমরা বলেছি, 'হ্যাঁ, কোনো সমস্যা নেই। আমাদের এতে কোনো আপত্তি নেই।’
এই লজিস্টিক ঝক্কি-ঝামেলা ইরানের বিশ্বকাপ স্বপ্নে বড় ধাক্কা দিল। ‘জি’ গ্রুপে তাদের মিশন শুরু হবে লস অ্যাঞ্জেলেসে, নিউ জিল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে। এর ছয় দিন পর ক্যালিফোর্নিয়াতে তারা মুখোমুখি হবে শক্তিশালী বেলজিয়ামের। আর গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচে সিয়াটলে মিশরের বিপক্ষে খেলবে টিম মেল্লি। প্রতিটি ম্যাচের আগেই মেক্সিকো সীমান্ত থেকে বিমানে উড়ে যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়া এবং ম্যাচ শেষেই আবার ফেরত আসার এই দমবন্ধ করা সূচি ইরানের ফুটবলারদের শারীরিক ও মানসিকভাবে কতটা ক্লান্ত করবে, সেটাই এখন বড় প্রশ্ন।
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক : মোঃ বাকী উল্লাহ
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত