শেখ আহমদ মিরাজ স্পোর্টস সম্পাদক।
ফুটবল বিশ্বকাপ মানে শুধু ট্রফির লড়াই নয়, এটি সময়ের বুকজুড়ে লেখা এক মহাকাব্য। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে কোটি মানুষের আবেগ, কান্না, উল্লাস আর স্বপ্নের নাম ফিফা বিশ্বকাপ। ১৯৩০ সালে উরুগুয়ের মাটিতে যে যাত্রা শুরু হয়েছিল, সেটি ২০২৬ সালে পৌঁছাবে এক অনন্য মাইলফলকে—বিশ্বকাপের ১০০০তম ম্যাচে। উত্তর আমেরিকার বিশ্বকাপে ২০ জুন মন্টেরেতে তিউনিসিয়া ও জাপানের ম্যাচটি হবে ইতিহাসের সেই বিশেষ ১০০০তম লড়াই। আফ্রিকা ও এশিয়ার দুই প্রতিনিধির এই ম্যাচ বিশ্ব ফুটবলের ইতিহাসে নতুন অধ্যায় লিখবে।
তবে এই হাজারতম ম্যাচের আগে বিশ্বকাপ দেখেছে অসংখ্য স্মরণীয় মাইলফলক। কিছু ম্যাচ কেবল ফলাফলের জন্য নয়, বরং ফুটবলের আবেগ, নাটকীয়তা ও ইতিহাসের কারণে হয়ে উঠেছে চিরস্মরণীয়।
প্রথম বিশ্বকাপ ম্যাচ (১৯৩০)
১৯৩০ সালের ১৩ জুলাই উরুগুয়ে বিশ্বকাপে একসঙ্গে শুরু হয়েছিল দুটি ম্যাচ। ম্যাচ যুক্তরাষ্ট্র ৩-০ গোলে হারায় বেলজিয়ামকে, আর ফ্রান্স ৪-১ গোলে পরাজিত করে মেক্সিকোকে। এই দুই ম্যাচই বিশ্বকাপ ইতিহাসের প্রথম ম্যাচ হিসেবে স্বীকৃত। ফ্রান্সের লুসিয়েন লরাঁ করেন বিশ্বকাপের ইতিহাসের প্রথম গোল। সেই মুহূর্ত থেকেই শুরু হয় ফুটবলের সবচেয়ে বড় মহাযজ্ঞের পথচলা।
১০০তম ম্যাচ (১৯৫৪)
সুইজারল্যান্ড বিশ্বকাপের তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচে অস্ট্রিয়া ৩-১ গোলে হারায় উরুগুয়েকে। এটি ছিল বিশ্বকাপের শততম ম্যাচ। বিশ্বকাপের শততম ম্যাচটি হয়েছিল ফাইনালের ঠিক আগে। তখন হয়তো কেউ ভাবেনি, ভবিষ্যতে এই টুর্নামেন্ট ফুটবলকে ছাড়িয়ে বৈশ্বিক সংস্কৃতির অংশ হয়ে উঠবে।
২০০তম ম্যাচ (১৯৬৬)
বিশ্বকাপের ২০০তম ম্যাচটি ছিল এক মহাকাব্যিক ফাইনাল। ওয়েম্বলিতে স্বাগতিক ইংল্যান্ড অতিরিক্ত সময়ে পশ্চিম জার্মানিকে ৪-২ গোলে হারিয়ে জেতে নিজেদের একমাত্র বিশ্বকাপ। সেই রাতে জিওফ হার্স্ট করেন ফাইনালের প্রথম হ্যাটট্রিক। ফুটবল ইতিহাসে তার নাম লেখা হয়ে যায় সোনালি অক্ষরে।
৩০০তম ম্যাচ (১৯৭৮)
আর্জেন্টিনা বিশ্বকাপে একসঙ্গে দুটি ম্যাচ ভাগ করে নেয় ৩০০তম ম্যাচের সম্মান। ইতালি হারায় অস্ট্রিয়াকে, আর পশ্চিম জার্মানি ড্র করে নেদারল্যান্ডসের সঙ্গে। সেই সময় বিশ্বকাপ যেন শুধু মাঠে নয়, কৌশল আর মানসিক লড়াইয়েও পৌঁছে গিয়েছিল নতুন উচ্চতায়।
৪০০তম ম্যাচ (১৯৮৬)
বিশ্বকাপের ৪০০তম ম্যাচে ডিয়েগো ম্যারাডোনার জাদুকরী বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা ১-০ গোলে হারায় উরুগুয়েকে। পেদ্রো পাসকুল্লির গোলেই আসে জয়। সেই বিশ্বকাপ পরে হয়ে ওঠে ম্যারাডোনার ব্যক্তিগত মহাকাব্য—যেখানে ‘হ্যান্ড অব গড’ আর শতাব্দীর সেরা গোল একসঙ্গে লিখেছিলেন কিংবদন্তি।
৫০০তম ম্যাচ (১৯৯৪)
যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বকাপে ৫০০তম ম্যাচের দিনে ছিল নাটকীয়তা আর উত্তেজনা। নাইজেরিয়া হারায় গ্রিসকে, আর বুলগেরিয়া চমকে দেয় আর্জেন্টিনাকে। ম্যারাডোনার ডোপ টেস্ট বিতর্কে কাঁপছিল ফুটবল বিশ্ব। সেই অস্থিরতার মধ্যেও বিশ্বকাপ এগিয়ে চলেছিল নতুন গল্প নিয়ে।
৬০০তম ম্যাচ (২০০২)
দক্ষিণ কোরিয়া-জাপান বিশ্বকাপে ফ্রান্স ও উরুগুয়ের গোলশূন্য ড্র ছিল ৬০০তম ম্যাচ। এটাই একমাত্র শততম মাইলফলক ম্যাচ যেখানে কোনো গোল হয়নি। শিরোপাধারী ফ্রান্স পুরো টুর্নামেন্টেই গোল করতে ব্যর্থ হয়ে বিদায় নেয়, যা আজও বিশ্বকাপ ইতিহাসের অন্যতম বড় হতাশা।
৭০০তম ম্যাচ (২০০৬)
জার্মান বিশ্বকাপে স্পেনকে ৩-১ গোলে হারায় ফ্রান্স। জিনেদিন জিদান, রিবেরি ও ভিয়েরার দাপটে ফরাসিরা আবারও বিশ্বমঞ্চে নিজেদের শক্তি দেখায়। এটাই ছিল জিদানের শেষ বিশ্বকাপের মহাকাব্যিক যাত্রার অন্যতম স্মরণীয় অধ্যায়।
৮০০তম ম্যাচ (২০১৪)
ব্রাজিল বিশ্বকাপে ৮০০তম ম্যাচটি খেলেছিল জার্মানি ও ঘানা। ২-২ গোলে ড্র হওয়া ম্যাচটি ছিল রোমাঞ্চে ভরা। মিরোস্লাভ ক্লোসে সেই ম্যাচে বিশ্বকাপ ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতা হওয়ার পথে গুরুত্বপূর্ণ গোলটি করেন। ফুটবল যেন সেদিন ইতিহাসকে নতুন করে ছুঁয়েছিল।
৯০০তম ম্যাচ (২০১৮)
রাশিয়া বিশ্বকাপের ফাইনালে ফ্রান্স ৪-২ গোলে হারায় ক্রোয়েশিয়াকে। ম্যাচটি ছিল ফুটবল বিশ্বকাপের ৯০০তম ম্যাচ। এমবাপ্পে, পগবা ও গ্রিজমানদের উজ্জ্বলতায় দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয় ফরাসিরা। এটি ছিল বিশ্বকাপ ইতিহাসের দ্বিতীয় ম্যাচ যেখানে শততম মাইলফলকের ম্যাচটি হয়েছে ফাইনাল।
অপেক্ষা ১০০০তম ম্যাচের
প্রথম বাঁশি থেকে হাজারতম ম্যাচ—বিশ্বকাপ যেন সময়ের সঙ্গে বেড়ে ওঠা এক জীবন্ত ইতিহাস। এখানে মহাকাব্য লিখেছেন পেলে, ম্যারাডোনা, জিদান, রোনালদো, মেসি ও এমবাপ্পেদের মতো কিংবদন্তিরা। আসন্ন আসরে ১০০০তম ম্যাচে তিউনিসিয়া ও জাপান যখন মাঠে নামবে, তখন সেটি কেবল একটি গ্রুপ ম্যাচই নয়—বরং প্রায় এক শতাব্দীর ফুটবল ইতিহাসকে ছুঁয়ে দেখার আরেকটি মহামুহূর্ত হিসেবেও ইতিহাসের পাতায় খোদাই হয়ে থাকবে।
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক : মোঃ বাকী উল্লাহ
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত