কক্স২৪নিউজ ডেস্ক।
সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় বাতিলের মাধ্যমে জনগণের আস্থার জায়গাটি ধ্বংস করা হয়েছে। এর ফলে বিচার বিভাগের স্বাধীনতার পথ রুদ্ধ করা হয়েছে। স্বাধীনতার পর থেকে বিচার বিভাগকে স্বাধীন করার নানা উদ্যোগ নেওয়া হলেও বাকশাল ও সামরিক শাসনের কারণে তা বাস্তবায়িত হয়নি বলে মন্তব্য করেছেন সুপ্রিম কোর্টের এডভোকেট শিশির মনির।
আজ বৃহস্পতিবার (২১ মে) দুপুরে মগবাজারে জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে বিচার বিভাগীয় সচিবালয় বাতিল ইস্যুতে এক সংবাদ সম্মেলনে শিশির মনির এসব কথা বলেন।
জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদের এ সদস্য বলেন, রাত ৩টায় আদালত বসিয়ে সাজা দিতে চাইলে, সেক্ষেত্রে বিচার বিভাগ নিয়ন্ত্রণের চেষ্টার অভিপ্রায় থাকে।
শিশির মনির বলেন, রাত তিনটার সময় কিংবা বিকালে কিংবা সন্ধ্যার সময় আদালত বসিয়ে যাকে ইচ্ছা তাকে সাজা দেওয়ার যদি অভিপ্রায় থাকে তবেই আইন মন্ত্রণালয় বিচার বিভাগকে নিয়ন্ত্রণ করতে চাইবে। আর যদি এই অভিপ্রায় কারো না থাকে তাহলে সুপ্রিম কোর্ট বিচারকদের নিয়ন্ত্রণ করবে। এখানে তো আইন মন্ত্রণালয়ের কোনো ভূমিকা থাকার কথা নয়। সরকারের কোনো ভূমিকা থাকার কথা নয়। যদি সরকারের বিরুদ্ধে আদেশ হয়, তাহলে সরকার আপিল করবে। কিন্তু বিচারককে পদোন্নতি দেবে না কেন?
বিচার বিভাগের স্বাধীনতার পথ রুদ্ধ করা হয়েছে উল্লেখ করে শিশির মনির বলেন, বিচার বিভাগীয় সচিবালয় বাতিলের মাধ্যমে জনগণের আস্থার জায়গাটি ধ্বংস করা হয়েছে। এর ফলে বিচার বিভাগের স্বাধীনতার পথ রুদ্ধ করা হয়েছে। স্বাধীনতার পর থেকে বিচার বিভাগকে স্বাধীন করার নানা উদ্যোগ নেওয়া হলেও বাকশাল ও সামরিক শাসনের কারণে তা বাস্তবায়িত হয়নি।
শিশির মনির আরও বলেন, নিম্ন আদালতের বিচারকদের নিয়োগ এখন স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় হলেও তাদের বদলি, ছুটি, পদোন্নতি ও শৃঙ্খলা বিষয়ক ক্ষমতা আইন মন্ত্রণালয়ের হাতে থাকায় স্বাধীনভাবে কাজ করা সম্ভব হয় না। বিচারকদের ওপর প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ থাকলে তারা স্বাধীনভাবে রায় দিতে পারেন না। এ সমস্যা সমাধানে প্রধান বিচারপতির অধীনে স্বাধীন বিচার বিভাগীয় সচিবালয় প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল, যেখানে ১৫ জন বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তাও নিয়োগ পেয়েছিলেন।
শিশির মনির বলেন, জুলাই জাতীয় সনদের ৩৬ নম্বর অনুচ্ছেদে বিএনপিসহ প্রায় সব রাজনৈতিক দল স্বাধীন বিচার বিভাগীয় সচিবালয়ের পক্ষে মত দিয়েছিল। এমনকি তৎকালীন অ্যাটর্নি জেনারেল, বর্তমান আইনমন্ত্রীও আদালতে হলফনামা দিয়ে সচিবালয় প্রতিষ্ঠায় সরকারের আপত্তি নেই বলে জানিয়েছিলেন। কিন্তু এখন সেই সচিবালয়ই বাতিল করা হয়েছে।
বিচারকদের স্বাধীনভাবে কাজ করতে না দিলে সভ্য সমাজ গড়ে উঠতে পারে না উল্লেখ করে শিশির মনির বলেন, স্বাধীন বিচার বিভাগ মানে বিচার যার পক্ষেই যাক না কেন তা মেনে নেওয়া। বিচারকদের স্বাধীনভাবে কাজ করতে না দিলে সভ্য সমাজ গড়ে উঠতে পারে না। সরকারের বিরুদ্ধে রায় হলে সরকার আপিল করতে পারে, কিন্তু বিচারকদের বদলি, পদোন্নতি আটকে দেওয়া বা শাস্তির ভয় দেখানো স্বাধীন বিচার বিভাগের বৈশিষ্ট্য হতে পারে না।
জামায়াতে ইসলামির কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদের এই সদস্য বলেন, বদলি, ছুটি, পদোন্নতি ও শৃঙ্খলা- এই চারটি বিষয় সম্পূর্ণভাবে সুপ্রিম কোর্টের নিয়ন্ত্রণে থাকা উচিত। আইন মন্ত্রণালয়ের হাতে এসব ক্ষমতা থাকলে অধস্তন আদালত স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারবে না।
শিশির মনির অভিযোগ করেন, বিচারকদের নিয়ন্ত্রণে রাখতেই আইন মন্ত্রণালয় সচিবালয়ের নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে রাখতে চায়। তিনি বলেন, সরকার যদি কোনো সিদ্ধান্ত নেয়, তা যদি সংবিধান সম্মত বা আইনসম্মত না হয়, বা পক্ষে বিপক্ষে রায় হলে বা অসন্তুষ্টি হলে আপিল করবে, কিন্তু বিচারকদের আমি আবদ্ধ করে দেবো; তাদের পদোন্নতি দেব না; তাদেরকে সুন্দরবন-বান্দরবন পাঠিয়ে দেবো; এটি কোনো স্বাধীন বিচার বিভাগের ক্যারেক্টার হতে পারে না।
শিশির মনির আরও বলেন, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী সর্বদা স্বাধীন বিচার বিভাগের পক্ষে। আমরা মনে করি বিচারকদের বদলি, ছুটি, পদোন্নতি আইন মন্ত্রণালয় হাতে থাকা উচিত নয়। এটা সম্পূর্ণভাবে সুপ্রিম কোর্টের কাছে থাকা উচিত। তিনি বলেন, বাতিল হওয়া আইনে প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন কমিটির মাধ্যমে সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং ৫০ কোটি টাকার বাজেট অনুমোদনের ক্ষমতাও ছিল। এছাড়া বিচারকের সংখ্যা বাড়ানোর ক্ষমতাও সুপ্রিম কোর্টকে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু এসব ক্ষমতাও কেড়ে নেওয়া হয়েছে। বর্তমানে দেশে প্রায় দুই হাজার বিচারক বিচারিক কার্যক্রম পরিচালনা করতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন বলেও দাবি করেন তিনি।
সংবাদ সম্মেলনে আরও উপস্থিত ছিলেন জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ, এহসানুল মাহবুব জোবায়ের, নির্বাহী পরিষদের সদস্য মোবারক হোসাইন, মহানগর উত্তরের প্রচার ও মিডিয়া সম্পাদক আতাউর রহমান সরকার।
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক : মোঃ বাকী উল্লাহ
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত