কক্স২৪নিউজ ডেস্ক।
আধুনিক নগরায়ণ ও যান্ত্রিক সভ্যতার বিকাশের সাথে সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে শব্দদূষণ। দৃশ্যমান দূষণ (যেমন—বায়ু বা পানি দূষণ) নিয়ে আমরা যতটা সচেতন, শব্দদূষণ নিয়ে ততটাই উদাসীন। অথচ এটি জনস্বাস্থ্যের জন্য এক ভয়াবহ হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, আবাসিক এলাকায় শব্দের সহনীয় মাত্রা হওয়া উচিত ৫০-৫৫ ডেসিবেল। কিন্তু আমাদের প্রধান শহরগুলোতে এই মাত্রা প্রায়ই ১০০ ডেসিবেল ছাড়িয়ে যায়, যা একে একটি 'নিরব ঘাতক' হিসেবে চিহ্নিত করার জন্য যথেষ্ট।
শব্দদূষণের প্রধান উৎসসমূহ
শব্দদূষণের পেছনে একাধিক কারণ দায়ী:
যানবাহন: অতিরিক্ত হর্ন বাজানো (বিশেষ করে হাইড্রোলিক হর্ন)।
নির্মাণ কাজ: রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ি, পাইলিং এবং ইট ভাঙার মেশিনের উচ্চ শব্দ।
শিল্প-কারখানা: অপরিকল্পিতভাবে জনবসতিপূর্ণ এলাকায় গড়ে ওঠা কারখানা।
মাইকের ব্যবহার: সভা-সমাবেশ, ওয়াজ মাহফিল বা উৎসবে উচ্চস্বরে মাইক ও সাউন্ড সিস্টেম বাজানো।
জেনারেটর: বিদ্যুৎ বিভ্রাটের সময় আবাসিক এলাকায় ব্যবহৃত উচ্চ শব্দসম্পন্ন জেনারেটর।
স্বাস্থ্যের ওপর বিরূপ প্রভাব
শব্দদূষণ কেবল বিরক্তির কারণ নয়, এটি মানবদেহে দীর্ঘমেয়াদী শারীরিক ও মানসিক ক্ষতি সাধন করে:
শ্রবণশক্তি হ্রাস: দীর্ঘ সময় উচ্চ শব্দের মধ্যে থাকলে মানুষের শ্রবণশক্তি চিরতরে নষ্ট হয়ে যেতে পারে।
হৃদরোগ ও রক্তচাপ: উচ্চ শব্দ রক্তচাপ বৃদ্ধি করে এবং হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ায়।
মানসিক সমস্যা: মেজাজ খিটখিটে হওয়া, অনিদ্রা, অবসাদ এবং মনঃসংযোগের অভাব দেখা দেয়।
শিশুদের ওপর প্রভাব: গর্ভবতী মা ও শিশুদের ওপর শব্দদূষণের প্রভাব মারাত্মক। এটি শিশুদের পড়াশোনায় ব্যাঘাত ঘটায় এবং তাদের মানসিক বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করে।
শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণে করণীয়
এই নীরব ঘাতকের হাত থেকে বাঁচতে ব্যক্তিগত ও রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন:
আইন প্রয়োগ: শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণ বিধিমালার কঠোর বাস্তবায়ন এবং উচ্চ জরিমানার ব্যবস্থা করা।
হর্ন নিয়ন্ত্রণ 'নো হর্ন জোন' বা শান্ত এলাকা (হাসপাতাল, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান) বৃদ্ধি করা।
পরিকল্পনা আবাসিক এলাকা থেকে কলকারখানা ও বাস টার্মিনাল সরিয়ে নেওয়া।
সচেতনতা: পাঠ্যপুস্তকে শব্দদূষণের কুফল অন্তর্ভুক্ত করা এবং গণমাধ্যমে প্রচার চালানো।
বৃক্ষরোপণ: রাস্তার ধারে ঘন গাছ লাগানো, যা শব্দ শোষণ করতে সাহায্য করে।
শব্দদূষণ কোনো সাধারণ সমস্যা নয়, এটি একটি নীরব মহামারি। আমরা নিজেরা সচেতন না হলে এবং আইনের সঠিক প্রয়োগ না থাকলে পরবর্তী প্রজন্ম এক বধির ও মানসিকভাবে বিপর্যস্ত সমাজে পরিণত হবে। সুস্থভাবে বেঁচে থাকার জন্য শান্ত ও শব্দমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক : মোঃ বাকী উল্লাহ
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত