কক্স২৪নিউজ ডেস্ক।
আজ দুঃসহ স্মৃতিময় ভয়াল ২৯ এপ্রিল। ২৯ এপ্রিলের দুঃসহ স্মৃতি উপকূলের মানুষকে এখনো কাঁদায়। ১৯৯১ সালের ভয়াবহ ২৯ এপ্রিল দিনটি বাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকার জন্য শোকাবহ দিন। দুঃসহ সে স্মৃতি এখনও কাঁদায় স্বজনহারা মানুষগুলোকে। সেই ধ্বংসযজ্ঞের স্মৃতি বয়ে নিয়ে আবারও উপকূলীয় মানুষের কাছে এসেছে দিনটি। বিগত একমাস ধরে প্রচন্ড খরতাপে উপকূলের মানুষের যেন প্রাণ ওষ্ঠাগত। ২৯ এপ্রিলের মতো ফের ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড়ের আশংকায় উপকুল বাসী। সেই ৩৫ বছর আগের ক্ষয়ক্ষতির কথা স্মরণ করে সেই স্মৃতি নিয়ে বেঁচে থাকা মানুষগুলো এখনো কাঁদে।
ওই ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসে তলিয়ে গিয়েছিল কক্সবাজার জেলার মহেশখালী, কুতুবদিয়া, চকরিয়া, কক্সবাজার সদর, চট্টগ্রামের আনোয়ারা, বাঁশখালীসহ দেশের ১৩টি উপকূলীয় জেলার শত শত ইউনিয়ন। ঘণ্টায় ২৩৫ কিলোমিটার বেগে প্রায় ৬ মিটার (২০ ফুট) উঁচু এ সাইক্লোনের আঘাতে সে কালরাত্রিতে ছিনিয়ে নেয় ৫ লাখ মানুষের জীবন। ১ কোটি মানুষ আশ্রয়হীন হয়ে সর্বস্ব হারিয়েছিল। যাদের ৪ ভাগের ৩ ভাগই ছিল শিশু ও নারী। এদেশের মানুষ ইতিপূর্বে ঝড় ও ঘূর্ণিঝড়ের সঙ্গে কম-বেশি পরিচিত ছিল, কারণ প্রতিবছরই এখানকার মানুষকে এ ধরনের ঝড়-জলোচ্ছ্বাসের সঙ্গে মোকাবেলা করতে হয়। এবং প্রতি দুর্যোগেই জীবন দিতে হয় অসংখ্য মানুষকে।
জানা যায়, ১৫৮৪ সালের পর ১৯৬১ সালে গুর্কির মরণ ছোবলে প্রায় ৬০ হাজারের অধিক লোকের প্রাণহানি ঘটে পশ্চিমবঙ্গসহ সমগ্র সুন্দরবন অঞ্চলে। এর পর এ অঞ্চলে সাইক্লোন, হ্যারিকেন, জলোচ্ছ্বাস ঘটে ১৭ বার। যার সর্বশেষ পুনরাবৃত্তি ঘটে ২৯ এপ্রিল ১৯৯১-এর সোমবার রাতে। এ গুর্কির আঘাত ছিল সর্বাধিক নির্মম। এ ধ্বংসলীলা ৭০-এর প্রলয়ঙ্কারী গৌর্কির চেয়েও ছিল বেশি শক্তিশালী। ফলে ক্ষতির পরিমাণও ছিল সর্বাধিক। এ ধ্বংসযজ্ঞ শুধু মানবশক্তির ক্ষয় করেনি বরং অচল, নিথর, নিস্তব্ধ করে দিয়েছে সব জনপদ। শিল্পবাণিজ্যসহ বিভিন্ন খাতে ক্ষতির পরিমাণ ১০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যায়।
এখনো উপকূলীয় অনেক এলাকা অরক্ষিত। বর্ষা আসলে সেই ভয়াল দিনের কথা স্মরণ করে আতংকে থাকে ভুক্তভোগীরা। ৩৫বছর আগে ঘটে যাওয়া ঘূর্ণিঝড়ের ভয়াল স্মৃতি এখনো তাড়া করে সেদিনের বেঁচে যাওয়া মানুষগুলোকে। ওই দিনের কথা মনে করলে এখনো অনেকে আঁতকে ওঠেন। ১৯৯১সালের ২৯ এপ্রিলে কক্সবাজার জেলার সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলো হচ্ছে কুতুবদিয়া, মহেশখালী, চকরিয়া ও পেকুয়া উপজেলা। ওই ঘূর্ণিঝড়ে কুতুবদিয়া দ্বীপে ৪০ থেকে ৫০ হাজার মানুষ মারা গিয়েছিল।
ভয়াল ওই ঘুর্ণিঝড়ে উপকুলীয় ১৯ জেলার ১০২ থানা ও ৯টি পৌরসভায় সরকারী হিসাব মতে ১ লাখ ৩৮ হাজার ৮৮২ জন নিহত, ১২ হাজার ১২৫ জন নিখোঁজ, ১ লাখ ৩৯ হাজার ৫৪ জন আহত হয়। মাছ ধরার ট্রলার, নৌকা, বৈদ্যুতিক খুটি, গাছ-পালা, চিংড়ি ঘের, স্কুল-মাদরাসা, পানের বরজ, লাখ লাখ গবাদি পশু, ব্রীজ কালভার্ট ভেঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত হয় হাজার হাজার কোটি টাকার সম্পদ। তাই ৩৪ বছর পার হলেও অতীতের স্মৃতি মুছে ফেলতে পারছেনা উপকুলবাসী।
দীর্ঘ ৩৫ বছরে এপর্যন্ত উপকুলে নির্মিত হয়েছে শত শত আশ্রয় শিবির। কিন্তু এখনো নির্মিত হয়নি টেকসই বেড়ীবাঁধ। টেকনাফ থেকে কুতুবদিয়া পর্যন্ত বেড়ীবাঁধ দিয়ে বর্ষা মৌসুমে এখনো পানি ঢুকে লোকালয়ে। মহেশখালীর ধলঘাটার মানুষ এখনো মানববন্ধন করে টেকসই বেড়িবাঁধের জন্য।
উপকূলের মানুষ প্রতিবছর তাদের স্বজনদের স্মরণ করে থাকেন দোয়া মাহফিল ও আলোচনা সভার মাধ্যমে। এবারেও দোয়ায় ও ঘরোয়া আলোচনায় হারানো প্রিয়জনদের স্মরণ করেছে স্বজনেরা। যার আঘাতে মারা যায় প্রায় ৫ লাখ মানুষ। যদিও সরকারি হিসাবে এ সংখ্যা দেড় লাখের মতো। ঘূর্ণিঝড়ের পর এক মাসের মধ্যে এর প্রভাবে ডায়রিয়াসহ নানা রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যায় আরো লক্ষাধিক মানুষ। সেদিনের সেই ভয়ঙ্কর তাণ্ডবে শুধু মানুষই নয়, লক্ষ লক্ষ গবাদী পশু, ফসল, বিপুল পরিমাণ স্থাপনা ও সম্পদ ধ্বংস হয়।
আকস্মিক সেই ঘূর্ণিঝড়ে উপকূলে পড়েছিল লাশের মিছিল। চারিদিকে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ছিল লাশ আর লাশ। সেই সাথে ধ্বংসস্তুপে পরিণত হয়েছিল বিস্তীর্ণ অঞ্চল। এই ধ্বংসলীলা দেখে কেঁপে উঠেছিল বিশ্ববিবেক। অনেকে চিরতরে হারিয়েছে স্বজন, সহায়-সম্বল ও আবাসস্থল। এখনো তারা সেই দুঃসহ স্মৃতির কথা ভুলতে পারেনি।
স্মরণকালের ভয়াবহতম ঘূর্ণিঝড় ও সামুদ্রিক জলোচ্ছ্বাসের তাণ্ডবের শিকার হয় দেশের দক্ষিণ ও দক্ষিণপূর্ব উপকুলীয় অঞ্চল কক্সবাজার, চট্টগ্রাম, মহেশখালী, সন্দ্বীপ, ভোলা, ফেনী, নোয়াখালী, পটুয়াখালী, বরিশালসহ ১৩টি জেলার ৭৪টি উপজেলার দেড় কোটি মানুষ। ওইদিন রাতে পূর্ণিমার ভরা জোয়ার থাকায় ঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের আঘাত হয়ে উঠেছিল আরো সর্বগ্রাসী ও প্রাণহানিকর।
কক্সবাজারের কুতুবদিয়া ও মহেশখালীই প্রলংয়কারী ঘূর্ণিঝড়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। এই অপূরণীয় ক্ষতি এখনো কাটিয়ে উঠতে পারেনি এখানকার অধিবাসীরা।
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক : মোঃ বাকী উল্লাহ
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত