মোহাম্মদ রাশেদ চকরিয়া উপজেলা প্রতিনিধি।
একসময় যে জনপদ পরিচিত ছিল বিষাক্ত তামাক চাষের জন্য, আজ সেই চকরিয়ার বরইতলীই দক্ষিণ চট্টগ্রামের 'ফুলদানি' হিসেবে খ্যাতি পেয়েছে। পাহাড় আর সবুজের কোল ঘেঁষে অবস্থিত এই ইউনিয়ন এখন তামাকের কালো ধোঁয়া ছাপিয়ে গোলাপের সুবাস আর লিচুর মিষ্টি ঘ্রাণে মৌ মৌ করছে। শ্রমজীবী মানুষের ঘুরে দাঁড়ানোর এই গল্প এখন সারা দেশের জন্য এক অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত।
সাভারের পর দেশের দ্বিতীয় 'গোলাপ গ্রাম'
সাভারের সাদুল্লাপুরের পর বরইতলীকেই বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম গোলাপ গ্রাম বলা হয়। এখানকার দিগন্তজোড়া বাগানগুলো যে কোনো পর্যটকের নজর কাড়তে বাধ্য। আশির দশকে স্বল্প পরিসরে শুরু হলেও বর্তমানে প্রায় ১০০ একরের বেশি জমিতে বাণিজ্যিকভাবে গোলাপ চাষ হচ্ছে। এখানে মূলত মেরেন্ডা, রাম্বা ও লিঙ্কন—এই তিন জাতের গোলাপের ফলন সবচেয়ে বেশি। প্রতিদিন ভোরে এখান থেকে হাজার হাজার সতেজ গোলাপ চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পৌঁছে যায়।
লিচুর জন্য চিরচেনা ঐতিহ্য
গোলাপের পাশাপাশি বরইতলীর অপর এক পরিচয়ের নাম হলো 'লিচু'। চট্টগ্রামের বিখ্যাত মিষ্টি লিচুগুলোর একটি বড় অংশ আসে এখান থেকে। লিচুর মৌসুমে পুরো ইউনিয়নের পাহাড়ী এলাকাগুলো লাল বর্ণ ধারণ করে। বিশেষ করে স্থানীয় এবং বোম্বাই জাতের রসালো লিচুর স্বাদ নিতে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পাইকাররা এখানে ভিড় জমান।
তামাকমুক্ত বিপ্লব: এক নীরব সামাজিক পরিবর্তন
বরইতলীর সবচেয়ে ইতিবাচক দিক হলো এখানকার কৃষকদের সচেতনতা। পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর তামাক চাষ ছেড়ে এখানকার মানুষ এখন ফুল ও ফলের চাষে মনোযোগ দিয়েছেন। কৃষকদের এই সাহসী সিদ্ধান্ত শুধু তাদের অর্থনৈতিক সচ্ছলতাই আনেনি, বরং পুরো এলাকার পরিবেশকেও বদলে দিয়েছে।
পর্যটনের নতুন সম্ভাবনা
কক্সবাজার মহাসড়কের পাশেই অবস্থান হওয়ায় বরইতলীর গোলাপ বাগানগুলো এখন জনপ্রিয় পর্যটন স্পটে পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে শীত এবং বসন্তের শুরুতে যখন বাগানগুলো ফুলে ফুলে ভরে ওঠে, তখন পর্যটকদের আনাগোনা বহুগুণ বেড়ে যায়। ছবি তোলা এবং বাগান থেকে সরাসরি সতেজ ফুল কেনার জন্য এটি এখন আদর্শ জায়গা।
সংকট ও উত্তরণের পথ
সাফল্যের পাশাপাশি কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে। স্থানীয় চাষিদের মতে:
হিমাগারের অভাব: কোল্ড স্টোরেজ না থাকায় অনেক সময় উত্তোলিত ফুল দ্রুত নষ্ট হয়ে যায়, যা চাষিদের আর্থিক ক্ষতির মুখে ফেলে।
প্লাস্টিক ফুলের দাপট: বাজারে কৃত্রিম ফুলের আধিপত্যের কারণে প্রাকৃতিক ফুলের বাজার মাঝেমধ্যে অস্থিতিশীল হয়ে পড়ে।
সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা, উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং একটি আধুনিক হিমাগার নিশ্চিত করা গেলে বরইতলীর এই ফুল ও ফল শিল্প আন্তর্জাতিক বাজারেও জায়গা করে নিতে পারবে। তামাকের বিষ ছেড়ে লাল গোলাপের সুবাস ছড়ানো বরইতলী আজ তার নিজস্ব মহিমায় ভাস্বর।
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক : মোঃ বাকী উল্লাহ
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত