সম্পাদকীয় কালাম।
তারুণ্যের পথচ্যুতি: অবক্ষয় রোধে প্রয়োজন সামাজিক জাগরণ:
একটি দেশের শ্রেষ্ঠ সম্পদ হলো তার যুবসমাজ। জাতীয় উন্নয়নের মূল চালিকাশক্তি আর আগামীর স্বপ্নদ্রষ্টা এই তরুণরাই যখন নৈতিক ও আদর্শিক জায়গা থেকে বিচ্যুত হয়, তখন জাতির মেরুদণ্ড নড়বড়ে হয়ে পড়ে। বর্তমান সময়ে আমাদের যুবসমাজের একটি বড় অংশ যে নৈতিক অবক্ষয়ের শিকার হচ্ছে, তা কোনোভাবেই এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। কিশোর গ্যাং কালচার, মাদকাসক্তি, এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অপব্যবহার আজ উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
যুব সমাজের অবক্ষয়ের মূল কারণ:
যুবসমাজের এই বিচ্যুতি রাতারাতি ঘটেনি। এর পেছনে কাজ করছে বহুমুখী সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক কারণ:
* পারিবারিক বন্ধনের শিথিলতা: মা-বাবার ব্যস্ততা এবং পারিবারিক শাসনের অভাব তরুণদের একা করে দিচ্ছে। ফলে তারা বাইরের নেতিবাচক প্রভাবে দ্রুত প্রভাবিত হচ্ছে।
* মাদকের সহজলভ্যতা: হাতের নাগালে মাদক পৌঁছে যাওয়ায় কৌতূহলবশত তরুণরা এর জালে জড়িয়ে পড়ছে, যা তাদের বিবেকবোধ নষ্ট করছে।
* অপ্রত্যাশিত বেকারত্ব: পড়াশোনা শেষ করে উপযুক্ত কর্মসংস্থান না পেয়ে অনেক মেধাবী তরুণ হতাশায় নিমজ্জিত হচ্ছে এবং অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছে।
* সংস্কৃতি ও আকাশ সংস্কৃতির নেতিবাচক প্রভাব: ভিনদেশি অপসংস্কৃতি এবং ইন্টারনেটে অশ্লীল ও সহিংস কন্টেন্টের অবাধ বিচরণ তরুণদের মনস্তাত্ত্বিক বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করছে।
* সুস্থ বিনোদনের অভাব: খেলার মাঠের সংকট এবং সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের অভাব তরুণদের চার দেয়ালের ভেতরে স্মার্টফোনে বন্দি করে ফেলেছে।
উত্তরণের উপায় ও প্রতিকার
যুবসমাজকে এই অতল গহ্বর থেকে টেনে তুলতে হলে কেবল শাসন নয়, প্রয়োজন ভালোবাসা ও সঠিক দিকনির্দেশনা।
* পারিবারিক সচেতনতা: সন্তান কার সাথে মিশছে, কোথায় সময় কাটাচ্ছে—সেদিকে অভিভাবকদের তীক্ষ্ণ নজর রাখতে হবে। পরিবারের ভেতরে নৈতিক শিক্ষার চর্চা বাড়াতে হবে।
* কর্মসংস্থান ও কারিগরি শিক্ষা: কেবল পুথিগত বিদ্যা নয়, যুবকদের দক্ষ জনশক্তিতে রূপান্তর করতে হবে যেন তারা আত্মনির্ভরশীল হতে পারে। বেকারত্ব দূর হলে হতাশা ও অপরাধ প্রবণতা অনেকাংশে কমে আসবে।
* মাদক নির্মূলে জিরো টলারেন্স: মাদকের সরবরাহ বন্ধে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে আরও কঠোর হতে হবে। পাশাপাশি পাড়া-মহল্লায় মাদকবিরোধী সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে।
* সুস্থ সংস্কৃতির বিকাশ: তরুণদের খেলাধুলা, বিতর্ক প্রতিযোগিতা এবং স্বেচ্ছাসেবীমূলক কাজে উৎসাহিত করতে হবে। পর্যাপ্ত খেলার মাঠ ও পাঠাগার নিশ্চিত করা জরুরি।
* ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষা: শৈশব থেকেই শিশুদের মধ্যে ধর্মীয় অনুশাসন ও মানবিক মূল্যবোধ রোপণ করতে হবে যেন তারা ভালো-মন্দের পার্থক্য বুঝতে পারে।
যুবসমাজ কোনো বিচ্ছিন্ন দ্বীপ নয়; তারা আমাদের সমাজেরই দর্পণ। তাদের বিপথগামিতা আসলে আমাদের সম্মিলিত ব্যর্থতা। সরকারের পাশাপাশি শিক্ষক, অভিভাবক এবং সচেতন নাগরিক সমাজ যদি ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করে, তবেই তরুণদের মধ্যে দেশপ্রেম ও নৈতিকতার পুনর্জাগরণ সম্ভব। মনে রাখতে হবে, আজকের বিনিয়োগকৃত সুস্থ তরুণ প্রজন্মই আগামী দিনের সমৃদ্ধ বাংলাদেশের কারিগর।
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক : মোঃ বাকী উল্লাহ
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত