কক্স২৪নিউজ ডেস্ক।
গুম-সংক্রান্ত কমিশনের প্রতিবেদনে ২০১২-১৩ সালে সংঘটিত গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের একটি সুসংগঠিত ও ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে। এতে বলা হয়েছে, ২০১৩ সালের ৪ ডিসেম্বর রাজধানী থেকে বিএনপি নেতা সাজেদুল ইসলাম সুমনসহ সাতজনকে গুম করা হয়। একই সময় শিবিরের একাধিক নেতাকর্মীও নিখোঁজ হন। এসব ঘটনায় র্যাব ইন্টেলিজেন্স ও সংশ্লিষ্ট ব্যাটালিয়নের ভূমিকার পাশাপাশি তৎকালীন শীর্ষ কর্মকর্তাদের সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া গেছে গুমসংক্রান্ত কমিশনের প্রতিবেদনে।
প্রতিবেদনে অভিযুক্ত যেসব কর্মকর্তার নাম এসেছে, তাদের মধ্যে রয়েছেন তৎকালীন র্যাব ইন্টেলিজেন্সের পরিচালক লেফটেন্যান্ট কর্নেল জিয়াউল আহসান, র্যাব-১–এর তৎকালীন অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল কিসমত হায়াত, র্যাব ইন্টেলিজেন্সের মেজর মোহাম্মদ মাহফুজুল-আমিন নূর, তৎকালীন মেজর আবদুল্লাহ আল মোমেন, ক্যাপ্টেন এইচ এম সেলিমুজ্জামান, র্যাব-৭–এর তৎকালীন অধিনায়ক ব্রিগেডিয়ার মিফতাহ উদ্দিন আহমেদ এবং টিএফআইয়ের তৎকালীন কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কর্নেল শাহীন আজাদ।
পাশাপাশি কমান্ড পর্যায়ে দায়ভার ছিল তৎকালীন র্যাব মহাপরিচালক এআইজি মো. মোখলেসুর রহমান, এডিজি (অপস) কর্নেল মজিবুর রহমান এবং র্যাব ইন্টেলিজেন্সের পরিচালক হিসেবে দায়িত্বে থাকা কর্নেল জিয়াউল আহসানের ওপর।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বন্দিদের এক স্থান থেকে অন্য স্থানে সরিয়ে নেওয়া, সরকারি নথি ধ্বংস এবং হত্যাকাণ্ডের সময় ভুক্তভোগীদের পরিচয় গোপন রাখার কারণে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তাদের চূড়ান্ত পরিণতি নির্ধারণ করা সম্ভব হয়নি। কমিশন বেঁচে থাকা ব্যক্তিদের সাক্ষ্যের মাধ্যমে তদন্ত চালালেও বহু ভুক্তভোগীর পরিচয় আজও অজানা রয়ে গেছে। একাধিক ঘটনায় নদীতে নামহীন লাশ ফেলে দেওয়ার ধরনও চিহ্নিত হয়েছে।
কমিশনের প্রতিবেদনে একজন প্রত্যক্ষদর্শী কর্মকর্তার বক্তব্য তুলে ধরা হয়। সেই কর্মকর্তা কমিশনকে বলেন, রাতে কর্নেল জিয়াউল আহসানের নির্দেশনা ও পরিকল্পনায় ইন্টেলিজেন্স উইংয়ের সদস্যদের সহায়তায় একটি ‘গলফ অভিযান’ পরিচালনা করা হয়। সেখানে নাম না জানা ৪ জন ব্যক্তিকে প্রথমে গুলি, পরবর্তীতে পেট কেটে সিমেন্টের বস্তা বেঁধে নদীর মোহনায় ফেলে দেওয়া হয়। সেই গলফ অপারেশনে আমি উপস্থিত ছিলাম।
‘গলফ অভিযান’ বলতে তারা গুলি করে ‘টার্গেট’ ব্যক্তিকে হত্যা করা বুঝাতেন।
নিখোঁজ বিএনপি নেতা সাজেদুল ইসলাম সুমন ও তার সাত সঙ্গীর ঘটনায় একাধিক সাক্ষ্যের ভিত্তিতে কমিশন নিশ্চিত হয়েছে যে পিকআপটি যৌথভাবে র্যাব ইন্টেলিজেন্স ও র্যাব-১ পরিচালনা করেছিল। এ ঘটনায় তৎকালীন র্যাব-১ এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল কিসমত হায়াত কমিশনের কাছে লিখিতভাবে স্বীকার করেছেন যে, তিনি অপারেশন সহজতর করতে একটি পেট্রোল টিম পাঠিয়েছিলেন। তবে তিনি জোর দিয়ে দাবি করেছেন, চূড়ান্ত পরিকল্পনা কিংবা ভুক্তভোগীদের পরবর্তী ভাগ্য সম্পর্কে তিনি অবগত ছিলেন না। পেট্রোল টিমের সদস্যরা পিকআপের সময় উপস্থিত ব্যক্তি হিসেবে র্যাব ইন্টেলিজেন্সের মেজর মোহাম্মদ মাহফুজুল-আমিন নূরকে চিহ্নিত করেছেন। যদিও মেজর মাহফুজ নূর পিকআপে সম্পৃক্ততার অভিযোগ অস্বীকার করে দাবি করেছেন যে, তার ভূমিকা কেবল মোবাইল ফোন ট্র্যাকিংয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল।
অনেক ভুক্তভোগীর পরবর্তী পরিণতি এখনো অজানা রয়ে গেছে বলে কমিশনের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
২০১২ সালের ১৭ এপ্রিল গুম হওয়া বিএনপি নেতা এম ইলিয়াস আলী এবং ২০১৩ সালের ৩ এপ্রিল শিবিরের সদস্য হাফেজ জাকির হোসেনের অপহরণ ও হত্যাকাণ্ডের তদন্তে কমিশন বহু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উদঘাটন করেছে বলেও উল্লেখ করা হয়।
প্রতিবেদনে বলা হয়, অপহরণে জড়িত একজন সৈনিকের সাক্ষ্য অনুযায়ী, তিনি তৎকালীন র্যাব ইন্টেলিজেন্সের ডিরেক্টর লেফটেন্যান্ট কর্নেল জিয়াউল আহসানের সাথে যুক্ত ছিলেন। মেজর আশরাফুল আবেদীন (মেজর নওশাদ) এবং তার দলের সঙ্গেও তিনি কাজ করছিলেন বলে কমিশনকে জানান।
হাফেজ জাকিরের অপহরণে একটি পিকআপ দলকে সংশ্লিষ্ট করা হয়েছিল, যার মধ্যে ছিলেন তৎকালীন মেজর আবদুল্লাহ আল মোমেন এবং ক্যাপ্টেন এইচ এম সেলিমুজ্জামান। এই দুই কর্মকর্তা পরবর্তীতে গুমে সরাসরি জড়িত থাকার কথা অস্বীকার করেছেন। তবে লেফটেন্যান্ট কর্নেল সেলিম স্বীকার করেছেন যে, তিনি মেজর মোমেনের দলের একজন সদস্য ছিলেন। কমান্ড পর্যায়ে দায়ভার ছিল তৎকালীন এআইজি মোখলেসুর রহমান (র্যাব ডিজি), এডিজি (অপস) কর্নেল মজিবুর রহমান এবং র্যাব ইন্টেলিজেন্সের পরিচালক কর্নেল জিয়াউল আহসানের ওপর।
প্রতিবেদনে বলা হয়, একাধিক রাতজুড়ে অপারেশনে প্রায় পাঁচজনকে হত্যার তথ্য, নদীতে লাশ ফেলার পুনরাবৃত্তিমূলক ধরণ এবং সংশ্লিষ্ট ইউনিট ও কর্মকর্তাদের সনাক্তকরণ সম্ভব হয়েছে। বেঁচে থাকা জয়নুল আবেদীনসহ অন্যান্য সাক্ষীদের তথ্য লেফটেন্যান্ট কর্নেল শাহীন আজাদ এবং র্যাব–৭ এর অধিনায়ক মিফতাহ উদ্দিন আহমেদের মাধ্যমে যাচাই করা হয়েছে।
কমিশন বলছে, এই তদন্তে প্রমাণিত হয়েছে যে পিকআপ ও হত্যাকাণ্ডে র্যাব ইন্টেলিজেন্স, র্যাব-১ এবং সংশ্লিষ্ট ব্যাটালিয়ন সরাসরি জড়িত ছিল।
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক : মোঃ বাকী উল্লাহ
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত